আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় দৈহিক বর্ণনা। কবি পৌত্র ইমদাদুল হক (শুকুর মুন্সি), সমসাময়িক বিবরণ, কবির কবিতাবলী ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ মতে আমরা তাঁর দৈহিক গঠন সম্পর্কে বলতে পারি যে কবির দেহের বর্ণ ছিল উজ্জ্বল শ্যাম। সহজ-সরল হাসি-খুশি প্রকৃতির এই মানুষটা ছিলেন লম্বা, একহারা ও স্বাস্থ্যবান পুরুষ । সম্মুখবর্তী দুটি দাঁত উঁচু ।
মুখ মণ্ডলে ছিল নূরানী চেহারা। সে চেহারা সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। মুখে ছিল লম্বা দাঁড়ি, মাথায় বাবরী চুল। পরে অসারতা বুঝে বাবরী কেটে ফেলেন। তিনি নিজেই বলেছেন-
“তাই পাগলা কানাই কয়
বাবরী ফেলে এখন মাথায় দিচ্ছে তাজ।
তিনি সদা গোল টুপি এবং সাধারণত: লুঙ্গি পাঞ্জাবি ব্যবহার করতেন। পক্ষান্তরে উজোল ছিলেন একটু বেঁটে ও কালো গোছের। উভয়ের গায়ের চামড়া ছিল একটু খস খসে ধরনের। দেখে দাদ বলে ভ্রম হত । আসলে ঐটাই ছিল তাদের গাত্র চর্মের বৈশিষ্ট্য। উজোল বাদ্যে ছিলেন ওস্তাদ ব্যক্তি। মুখে ছিল পাতলা দাড়ি। মাথার চুল ছিল ছোট।
তিনি সাদা টুপি ব্যবহার করতেন । উজোল সাধারণত গান করতেন না। বড় ভাইয়ের গানের দলে বাদ্যকার হিসেবে তিনি জীবন কাটান । সাথে সাথে তিনি পালি দোহারীও করতেন। দু’ভাইয়ের গলার স্বর ছিল উচ্চ ও সুমিষ্ট। দু’মাইল দূর থেকেও তাদের গলার স্বর শোনা যেত। সে সুরে মানুষ পতঙ্গের ন্যায় ছুটে আসতো। চারণ কবির পক্ষে এটাই ছিল স্বাভাবিক ।
কবি আসরে অভিনয়ের মাধ্যমে গান করতেন। সর্বদায় হাসি-খুশি মুখ। এমন কোন ব্যক্তিই তৎকালে ছিল না যে কবির নামে পাগল ছিল না। বিভিন্ন গুণাবলী ও মধুর ব্যবহার এবং আদর্শের প্রভাবে জনগণের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন। অকৃত্তিম ভালবাসা, ভক্তি ও শ্রদ্ধা ।
কবি সর্বদাই কি পড়তেন তা বুঝা যেত না । এ সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত। সর্বদা তিনি ফকির সাহেবের দেয়া নাম, কালেমা বা এসমে আজম পড়তেন । এমনি ধরনের নানা কথা শোনা যায় । স্বাভাবিক অবস্থায় তিনি নিচু স্বরে কথা বলতেন। পথ চলার সময় হাত-মাথা নেড়ে নেড়ে কারও সাথে কথা বলার ভঙ্গি করতেন। এটা ছিল তার বিশেষ প্রকৃতি । আর প্রকৃতির পাগলের পক্ষে এটাই ছিল স্বাভাবিক । লোকে দূর থেকে দেখে পাগলই মনে করতো । তাই কবি আক্ষেপ করে বলেছেন-
আবার আমি একলা দুকলা পথে চলি,
হাত নাড়ি আর মাথা নাড়ি ‘তোর’ সংগে কই কথা।
তফাতের লোকে দেখে বলে-
পাগল বুঝি নাড়ে মাথা। (মৎ সংগৃহিত, ২৮ নম্বর পদ)
এখানে ‘তোর’ শব্দটা ব্যবহার হয়েছে। এ ‘তোর’ শব্দটা কোন স্থানে ব্যবহার করা যায় তা শিক্ষিত লোক মাত্রই বুঝতে পারবেন । এ বিষয়ে বেশি আলোচনা না করে আমরা এ কথা বলতে পারি যে তিনি সর্বদা “বাকা বিল্লাহ” স্তরে পৌঁছে অনুধাবন করতে পেরেছেন, এ তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ।
চারণ কবি পাগলা কানাই সু-স্বাস্থের অধিকারী হলেও সুদর্শন ছিলেন না। বালো শারীরিক অবস্থাও ভাল ছিল না। অভাব-অনটনের সংসারে স্বাভাবিক ভাবেই তিনি ছিলেন দুর্বল ও রোগা। মারাত্মক প্লীহা রোগেও ভুগতেন বলে জানা যায়। পরবর্তী কালেও দেখেছি ভয়ানক কঠিক রোগে আক্রান্ত হতে। নিম্নের কবিতাংশগুলির প্রতি লক্ষ্য করলে সহজেই বুঝা যায় তার দৈহিক গঠনের প্রকৃত স্বরূপ।
উজোলের মাজা কুজো, পাগলা কানাইর দুই দাত উঁচো।’
‘আবার একটুখানি বেদ্রুত দেখায় খস খসে আর দাদো গা। করবো কিরে ভাই সকলরা, করনে আওলা বিধাতা ।
‘কেউ বলে ভাই এক কর্মে লাগে হয় লাঙ্গলের মুড়ো।
‘কেউ বলে ভাই পাগলা কানাই-ঠিক রথের ছুঁড়ো।
‘এর গনেশের মতো দত্ত ছিল-পরনে ছিল দা’ড়ে তেনা । শোনো বলি কানাই হলি-থাকতো দস্তের নিশানা ।
(মৎ সংগৃহীত)
দৈহিক গঠন কবির যেমনই হোক না কেন যৌবনের প্রারম্ভে তিনি পেয়েছিলেন অধিকতর সুন্দর স্বাস্থ্য। মৃত্যুকাল পর্যন্ত এই সুন্দর স্বাস্থ্য নিয়েই তিনি দেশ- বিদেশে পাল্লা করে বেড়িয়েছেন । জনাব আবুল আহসান চৌধুরী সাহেব ‘পাগলা কানাই’ গ্রন্থে মৃত্যুর দশদিন আগেও কবিকে পান্না গানের কথা বলেন। তবে একথা সত্য যে, দূরারোগ্য ব্যাধি তার দেহটিকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলে। কিন্তু কবি সাধনা বলে দেহটিকে মৃত্যু পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। তার দৈহিক বর্ণনায় নিচের কবিতাটি লক্ষণীয়-
সবে বলে পাগলা কানাই ভালো ভাই, ও তুই যমন পুরুষ তমন ছিরি,
দেখলে ঘৃণা ওঠে,
ও নাম করেছিস বটে। হাটিশ যমন বগের হাটা,
পায় ফুটলো তোর কিসির কাঁটা,
ওরে ও পেট ডগরে বিটা- নামে তোর গগন ফাটে।
এই উজোল কি তোর ছোট ভাই?
শুনতে পাই- ওরে বিধাতার কি কাজ ছিল না,
গঠেছে কি ছিরি ।
দেখে আহা! মরি মরি
নাম করো যেমন জগৎ জোড়া,
দুই ভাইর দেখি ছন্ন ছাড়া,
কেউ কুঁজো কেউ টেংগুশ পাড়া,
দেখে হাসে মরি ॥
আর ওরা সভাই আসে যখন,
আমরা চায়ে দেখি তখন;
লালুয়া-ভলুয়া দাঁড়ায় যমন ।
ওমনি তো দুটি ভাই, যমন কানাই আর বলাই ।
কানাইর যমন গলায় দাঁড়ি উজলের হাত-পা নড়ি,
ঐ বিটার নাম এতই ভারি,
চল ফিরে যায় বাড়ি
Table of Contents
দৈহিক বর্ণনা

নাম প্রসঙ্গ
নাম দেখে চারণ কবি পাগলা কানাইকে মুসলমান হিসেবে মনে হয় না। কিন্তু তিনি ছিলেন খাঁটি ইমানদার মুসলমান, একজন আল্লাহর ওলী । কানাই তার পিত দত্ত নাম। সে যুগে এমন নাম মুসলিম সমাজে প্রচলিত ছিল। তিনি শেখ সাদী (রঃ) এর বংশধর হলেও শিক্ষা-দিক্ষা ও ধর্মীয় আদর্শের সে যৌলুশে অনেক ভাটা পড়ে। সম্ভবতঃ শিক্ষার অভাবই ছিল এর প্রধান কারণ। শিক্ষা মানুষকে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দিতে পারে।
তাই, শিক্ষার অভাব ও কুসংস্কার এই পরিবারের মধ্যে এমনভাবে দেখা দেয় যে তারা বংশের পূর্বেকার মান-মর্যাদা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলেন। এমনি ধারার উদাহরণ সমাজে ভুরি ভুরি দেখা যায় । তৎকালে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এই ধরনের নাম যথেষ্ট প্রচলিত ছিল।
কবির সমসাময়িক মুসলমান কবিদের মধ্যে ইদু বিশ্বাস, মেহের চাঁদ, নবীন বিশ্বাস, হারান মন্ডল, গোলাপ খাঁ, মাধব গাইন, যাদব সরকার, নিতাই মোল্লা, নবা হাজী, পাঞ্জু শাহ, লালন ফকির, কোকিল শাহ প্রমুখের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব নামের পিছনে শিক্ষা, তৎকালীন ধর্ম ও সংস্কারের অভাবই ছিল বেশী। আজকালকার বহু শিক্ষিত সমাজ বাঙ্গালীপনার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিকৃত নামের ব্যবহার শুরু করেছে। কবি বংশেও এ ধরনের নামকরণের প্রচলন দেখা যায় ।
কবির কবিতাবলী বা গানের ভণিতায় ‘পাগলা কানাই’, ‘পাগলকানাই’, ‘পাগলা’, ‘কানাই’, ‘কানাই পাগলা’ প্রভৃতি নাম দৃষ্ট হয়। তবে, ‘পাগলা কানাই’ নামই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে । এখন কানাই যদি তার পিতৃ দত্ত নাম হয়, তাহলে পাগলা শব্দটা কি করে নামের সাথে যুক্ত হলো তা দেখা যাক ।
আমরা পূর্বেই বলেছি, বাল্যে কবি চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর গানেও এ কথার ইঙ্গিত মেলে। ধী-শক্তি সম্পন্ন বালকের চাঞ্চল্য প্রকাশ স্বাভাবিক । তিনি ভবঘুরে জীবন-যাপন পছন্দ করতেন। কারণ, বাংলার প্রকৃতি তাঁর কাছে অপরূপ রূপে ধরা দিয়েছিল । তাই বোধ হয় তিনি মথিত করে ফিরেছেন সারা বাংলার আনাচ- কানাচ । তাঁর বহির্মুখী জীবন বোধ তাকে পাগল করে তুলেছিল।
কবির এই ভাবুক প্রকৃতির কারণে তাঁকে পাগল বলে মনে হত । কবি ছিলেন গরীব ঘরের এক চাষীর সন্তান। তৎকালীন ভদ্র ঘরের মানুষ তাঁকে তাচ্ছিল্য করে পাগলা আখ্যা দিলেও করার কিছু ছিল না। কিন্তু সেই ভদ্র সমাজ কি জানতো যে তাদের উপেক্ষিত পাগলই একদিন দেশবরেণ্য খ্যাতি অর্জন করবেন ?
সমাজে দেখা যায় বড় বড় জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গ আপন দেশ ও জন্মভূমি কর্তৃক কখনও সমাদৃত হন নি । কবির ঊর্ধ্বতন পুরুষ শেখ সাদী (রঃ)ও জন্মভূমি কর্তৃক বিতাড়িত হন । ‘আনাল হক’ উচ্চারণ করে মরমী সাধক মনসুর হাল্লাজও পাগল আখ্যা পান এবং শরীয়তের শাসনে তাকে মৃত্যুদণ্ড পেতে হয়। আলোচ্য কবির পূর্ব পুরুষগণও একই দুর্ভোগে পতিত হন ।
প্রতিভাধারী পাগল আর সত্যিকারের পাগলদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় পার্থক্য করায় যায় না। বস্তুত, সাধারণ লোকে প্রতিভা বুঝতে না পেরে তাকে সত্যিকারের পাগল বলেই মনে করে। কবি পাগলা কানাই এ থেকে বাদ পড়েন নি।
আবার আমরা অনেক সময় সত্যিকারের পাগল দেখে কামিল ফকির’ আখ্যা দিয়ে থাকি । চারণ কবি পাগলা কানাই এর সাদা-সিধা, সহজ-সরল জীবন দেখে তাঁকে পাগল বলে আখ্যায়িত করা স্বাভাবিকই বলা যেতে পারে। বাল্যে কবির পাঠশালা জীবনেও দেখি তাঁকে পাগল বলে আখ্যায়িত হতে। পাগলা ক্ষেপার মতো বন্ধনহীন জীবনকে সাধারণ মানুষ পাগলামী বলে মনে করে। কবির কথায় আমরা সে পরিচয় পায়-
পাগলা ছোঁড়ার হবে না কিছু-
ঠাট্টা করে কয় সবে ।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, বাল্যে ক্ষেপামীর জন্য তিনি পাগলা উপাধি পেয়ে থাকবেন । পূর্বে আমরা কালিকা দহের তীরের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছি। সেই থেকে পরবর্তীকালে পাগলা শব্দের ব্যবহার তিনি নিজেই করেছেন বলে যে প্রচলিত বিশ্বাস অত্র অঞ্চলে আছে তাও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। বরং এটাই যথার্থ বলে মনে হয়। কেননা সেই দরবেশের প্রভাব কবির মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল।
সেই দরবেশের দোয়া কবির জীবনে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছে । তাঁর প্রভাব পড়ায় স্বাভাবিক। কবি এই দরবেশের নিকটই আত্মিক ও আধ্যাত্মিক সাধনায় জ্ঞান লাভ করেন। কবি এই দরবেশের পরিচয় বলে যান নি বা তিনিও কোন পরিচয় দিয়ে যান নি।
প্রচলিত আছে যে, তিনি ছিলেন- ‘খিজির (আঃ)’ । তিনি কবিকে প্রকৃতি বা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে যান। আর সে কারণেই তিনি তাঁর কোন পদাবলীতে ওস্তাদের নাম উল্লেখ করতে পারেন নি। প্রসঙ্গতঃ এখানে অত্র এলাকায় প্রচলিত আরও একটি ঘটনার উল্লেখ করবো।
ছেলেবেলা থেকেই কবির গুন গুন করে গান গাওয়ার অভ্যাস ছিল। পানের একজন অতি বড় ভক্ত ছিলেন তিনি । একদিন শোনা গেল নলডাঙ্গা রাজবাড়িতে এক পাল্লাগান হচ্ছে। পাল্লা গানের কথা শুনে বালক কানাই যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন । কিন্তু কিছুতেই অন্যান্য সংগী-সাথীরা তাঁকে যেতে দিল না। বরং গরু- বাছুর বাড়ি নিয়ে যেতে বাধ্য করলো । তিনি কাঁদতে কাঁদতে পালের পিছু পিছু আসতে লাগলেন ।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ প্রায় । মনের দুঃখে বালক কানাই চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বাড়ি ফিরছেন । পথে দেখা হলো এক বৃদ্ধের সাথে। পরণে তাঁর সাদা বসন, মাথায় টুপি, হাতে লাঠি, মুখে লম্বা দাড়ি। তিনি বালকের নিকটে এসে তাঁর ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। কবি বললেন, “আমি আমার দুঃখে কাঁদছি, তুমি তোমার পথে যাও”।
বৃদ্ধ নিজ পরিচয় দিয়ে বললেন যে তিনি খাজা খিজির (আঃ)। পরিচয় পাবার সাথে সাথে বালক তাকে দেখে ভক্তি ও শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত করলেন । কানাই কান্নার কারণ খুলে বললেন। খাজা সাহেব মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “ওরে, পাগল, তুই কার গান শুনতে যাবি? তুই গান শুনতে চাস? তোর গানই লোকে শুনবে” । এই বলে বৃদ্ধরূপী খাজা খিজির (আঃ) বালক কবিকে দোয়া করলেন। মাথায় একটি ফুক দিলেন এবং জিহবাতে কি একটা লিখে দিলেন। কণ্ঠে দিলেন চুমু।
স্বপ্নাবিষ্টের মতো যেন সব কিছু ঘটে গেল। তিনি বাড়ি চলে এলেন। খিজির (আঃ) কবিকে প্রকৃতির কোলে ছেড়ে দেন । প্রকৃতিই তাঁর ওস্তাদ বা শিক্ষা গুরু। তাই কবি পাগলা কানাই কোন গান বা কবিতায় ওস্তাদের নাম উল্লেখ করতে পারেন নি। ড. মযহারুল ইসলাম সাহেব একটা গানের অবতারণা করেছেন ছাড়া আর কেউ কোথাও বলেননি। আমরাও এ গানের প্রতি সন্দেহ পোষণ করি । অত্র অঞ্চলে আমরাও উক্ত গানের হদিস পাইনি।
ড. সাহেব একটা কবিতায় মাত্র ওস্তাদ আমার নয়ান/নয়ন ফকির বলে উল্লেখ করেছেন। এতে বোঝা যায় কেশবপুরের নয়ন ফকির পাগলা কানাইয়ের গুরু ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি বেড়বাড়ি গ্রামের বেতার শিল্পী জনাব মোঃ আব্দুর রশিদ সাহেব আমাকে একটা কবিতা সরবরাহ করেছেন । তাতে নয়ন ফকির শিষ্য হিসাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা এই কবিতাটাই সঠিক বলে মনে করি । নিচে কবিতা দুটির অংশ বিশেষ তুলে দিলাম ।
পাগলা কানাই কয়, নয়নরে-
তুই যে কপাল পোড়া । (২৩৫ নম্বর পদ)
ড. সাহেব সাতানী চরের নয়ান ব্যাপারীর কথা বলেছেন । ৪৭৫ নম্বর পদ এবং অন্য এক পদে, “বরজোক ঠিক রাখ নয়ান” বলে উল্লেখ করেছেন। এসব দিক বিচার করলে ব্যাপারটা বড়ই গোলমেলে মনে হয়।
বৃদ্ধের আশীর্বাদ প্রাপ্ত হবার পর দিন থেকেই বালক কানাই-এর প্রতিভার স্ফূরণ ঘটতে শুরু করলো। অতি অল্প দিনের মধ্যেই তিনি গানের জগতে শক্তিশালী পাল্লা গায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেন এবং এই ঘটনার পর থেকেই খাজা বাবার সম্মানিত আহবান ‘পাগলা’ ডাক মনের অজান্তেই তাঁর নামের সংগে জুড়ে গেল।
এমনই ধরনের বহুল প্রচলিত মতামত তাঁর নামের ইতিহাসে দেখা যায়। যাই হোক, কবির পাগলা উপাধি তাঁর জীবনে যে স্বার্থকতা এনেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই । সর্ব শেষে আমরা বলতে চাই যে কবি পাগলা কানাই-এর প্রকৃত ও পিতৃ দত্ত নাম “কানাই’। আর পাগল বা পাগলা শব্দটা উপাধি মাত্র। তাঁর পদেই আমরা সে ইঙ্গিত পায়-
যে দিন নেবে অন্ধকার কবরের মাঝে,
ভাই-বোন সব কানবে আফসোসে ।
থাকলো পড়ে, মুলুক জুড়ে পাগল নাম
কানাই চললো দেশে। (মৎ সংগৃহিত, ১১০ নম্বর পদ)
বাউল সমাজ ও পাগলা কানাই (ধর্ম মত)
অনেকে মনে করেন, “বয়াতি ফকির মাত্রই বাউল মতাবলম্বী। কবি পাগলা কানাইও ছিলেন বাউল। এবং বাউল কবিদের মধ্যে লালন, মদন, পাগলা কানাই, ঈশান, দীনু, পাঞ্জু শাহ, যাদু বিন্দু প্রভৃতি প্রধান” । চারণ কবি পাগলা কানাই কোন ধর্মাবলম্বী ছিলেন এখন সে বিষয়ে এবারে আলোচনা করা যাক। অর্থাৎ তিনি ইসলাম ধর্ম পালন করতেন, না অন্যান্য বয়াতি ফকিরদের মতো বাউল মতাবলম্বী ছিলেন।
তিনি ‘না-রাহা’, ‘নাড়া/ন্যাড়া’, ‘যার আত্মিক মুক্তির কোন পথ নেই’ পন্থি ফকির ছিলেন, না শরিয়ত পন্থি মুসলমান ছিলেন? না তিনি, “মুন্ডিত-মস্তক-বৈষ্ণব-সম্প্রদায় বিশেষ”, না তিনি “বৈষ্ণব ও বাউল প্রভাব মুক্ত মুসলমান সম্প্রদায় বিশেষ, লালন শাহ-এর মতাবলম্বী সম্প্রদায় বিশেষ ছিলেন?
অপর পক্ষে কবি পৌত্র জনাব ইমদাদুল হক সাহেব বেড়বাড়িতে কবির জন্মবার্ষিকীতে এক ভাষণে বলেন, “আমার দাদা হুজুর কেবলা কেবলমাত্র কাদরীয়া তরিকার একজন খাঁটি মুসলমানই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ফকিরে কামিল-আল্লাহর ওলি”। কবি পৌত্রের এই উক্তি কতদূর সত্য তা আলোচনার আগেই দেখা যাক ‘বাউল’ কি এবং তাদের মতবাদই বা কি?
“সংস্কৃত ‘বাতুল’ শব্দ থেকে বাউল যার অর্থ বিশেষ সম্প্রদায় বিশেষ । এরা হিন্দু বা মুসলমান আচার অনুসারে চলে না । এদের সাধনার প্রধান অংগ ‘সংগীত ও রসালাপের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সম্ভোগ মাত্র । বাউল কোন ধর্মমত নয় বরং অভিরুচি অনুসারে সাধনার ধারা মাত্র ।
বাউল বা না-রাহা সম্প্রদায়ের সার কথা হলো, “এরা বাতেনি দরবেশ ফকির বলে দাবী করে। জাহেরি ৩০ পারা কোরআন শরীফকে অমান্য করে বাতেনি ও খাঁটি ১০ পারা কোরআনই আসল কোরআন বলে দাবী করে। কারণ, জাহেরি কোরআনের প্রথমেই লিখিত ‘জালে-কাল কেতাব’-এর বিকৃত অর্থ করে বলে, ‘এই কেতাব জাল’ ।”
এরা নাকি চর্ম চক্ষে খোদাকে দেখে থাকে । কোরআন ও হাদিসে যা প্রকাশিত হয়নি এবং রসুল (সঃ) যে বিষয়সমূহ বুঝতে পারেন নি বা খোদা কর্তৃক প্রাপ্ত হন নি তার সকল কথায় এই ১০ পারা কোরআন’ অর্থাৎ ‘দেল কোরআনে পাওয়া যায় ।
এরা তৈল সেবা, স্ত্রী অংগ, পুরুষ অংগ, বীর্য সেবা করে থাকে। ‘পঞ্চারস’ বলে কথিত মানুষের “মল, মুত্র, রজঃ, বীর্য ও রক্ত” অতি পবিত্র জ্ঞানে ভক্ষণ করে। গর্ভপাত শিশু, গাঁজা-ভাঙ ও নারী সেবা করে মনকে পবিত্র করে। নারী সাধনা বাউলদের প্রধানতম অংগ। মাতা, ভগ্নি, নাতী-নাতনি, চাচী, ফুফু, খালা, ভাতৃ- জায়া প্রভৃতি সকলকেই স্ত্রী জ্ঞানে ভোগ করা যায়। কারণ, ‘অহিংসা পরম ধর্ম। গাছ লাগিয়ে তার ফলও খাওয়া যায়। শিষ্যের পত্নী ও কন্যা দ্বারা শুরু সেবা না দিলে প্রকৃত ধর্ম পালন হয় না।
শিষ্যও সমভাবে গুরু গৃহে গমন করতে পারবে। এ না করলে সেই ‘অধর’ কে ধরা যায় না। তাছাড়া, স্ত্রী জাতি গঙ্গা স্বরূপ’। সকলেই তাকে ব্যবহার করতে পারে। এবং ‘আপন স্ত্রী-কন্যা দ্বারা গুরুকে সেবা না দিলে পাপের শেষ থাকে না’। কেননা, ‘মুর্শিদ বা গুরুই হল খোদা। গুরুকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই খোদাকে সন্তুষ্ট করা যায়’। তাই বাউল কুল শিরোমনি লালন শাহের ‘মুরশিদ খোদা ভাবলে জুদা, পড়বি প্যাচে” বাক্যটি অলঙ্ঘনীয় । প্রতিটা শিষ্যকে এ নিয়ম মেনে চলা অবশ্য কর্তব্য।
তারা বলে, তুমি যখন মাতৃগর্ভে ছিলে, হায়েজের রক্ত পান করতে। ইহা তোমার নিকট ছিল অতি পবিত্র আহারীয় । মহান আল্লাহ পাক কালামে বলেন, ‘হে নবী, আমি তোমাকে কাওছার দিয়াছি”। এই ‘কাওছার’ অর্থাৎ হায়েজের রক্ত পান করা অবশ্য কর্তব্য । এরা, এই বিকৃত অর্থ করে ।
বাউল মতবাদের মধ্যমনি ও প্রসিদ্ধ বাউল কবি লালন শাহের অনুগামী যাদু বিন্দুর গানে আমরা দেখতে পায়, ‘জোয়ার এলে নৌকা খোলে, ছাড়ে না ভাটার সময়” । অর্থাৎ এই ‘জোয়ার’ অর্থ মাসিক অবস্থায় স্ত্রী সম্ভোগ ও তা পান করার মধ্যেই রয়েছে সর্ব প্রকার আধ্যাত্মিক ও মারফতি বিদ্যা। যা রসুল (স:) বা কোন কেতাবধারী ব্যক্তিই অর্জন করতে পারেন নি ।
এরা কেয়ামত, ফেরেশতা, বেহেস্ত, দোজখ, জ্বিন কিছুই বিশ্বাস করে না। হয়রত (স:) এর নিকট কোন ওহি আসে নি । জিব্রাইল অর্থ জিহবা ছাড়া আর কিছুই নয় । মুহাম্মদ (স:) এর ১৪ টা বিবাহ লাম্প্যটেরই প্রমাণ করে । শ্রীকৃষ্ণ এই সব নবী-রাসুলদের হোতা। এক কথায় বাউল সম্প্রদায় কোন ধর্মই স্বীকার করে না এরা মরা জীব-জন্তুর মাংস খায়। ‘জীব হত্যা মহা পাপ’ বিধায় জবেহ করে কোন জীবের মাংস খাওয়া এদের কাছে অধর্ম। এমনকি, কোরবানী করে জীব হত্যা:
করা মহাপাপ, হারাম। “যতো আল্লাহ ততো কাল্লাহ’ বলে প্রত্যেকেই এক একজন আল্লাহ বলে দাবী করে। এসব স্ত্রী-পুরুষ খোদা-ভায়ালাগণ উলঙ্গ অবস্থায় নাচ-গান করে এবং উভয়ের যে বীর্যপাত ঘটে তা দ্বারা ‘প্রেম ভাজা’ নামক উপাদেয় খাদ্য তৈরি হয়।
এরা বলে, ‘কোরআনে কোথাও নামাজ পড়ার তাগিদ নেই । এটা শরিয়তের ‘মৌ-লুভি’দের কম সিদ্ধি করবার জন্য প্রচারিত মসলা । এরাই সমাজকে কলুষিত করছে। নামাজ কায়েম না করে শুধু পড়ার কথা বলছে। এরা স্ত্রী-যোনী ও অগ্নিকে সেজদা করে । কারণ, শয়তান সর্বস্থানে সেজদা করেও এখানে সেজদা না করে শয়তান হয়েছে। তাই, এরা আর শয়তান হতে চায় না। মারফত হলো আসল বস্তু । শরিয়তের ছাল দিয়ে কোন লাভ নেই । শরিয়তির বিবাহ বন্ধনেরও কোন প্রয়োজন নেই ।
মক্কায় যেয়ে হজ্জ করে অর্থ ধ্বংস না করে ‘কুলুবিল মুমিনিন’-এ মানব দেহ পূজা করলেই সব পাওয়া যায়। কারণ, খোদা ‘মীন’ রূপে মানব দেহে ‘বীর্যরূপ’ ধারণ করে এই মানব দেহে বিরাজ করে । যা রক্ষা করলে ব্রহ্মত্ব রক্ষা করা হয় ।
এই হল মোটামুটি ‘বাউল বা নাড়া’ মতবাদের সার কথা। এখন পবিত্র কোরআর-হাদিসের আলোকে আলোচনা করে দেখা যাক। সুরা তওবা, বাকারা এবং হাদিস ও ফতোয়া গ্রন্থ শামী ও আলমগীরি প্রভৃতিতে বর্ণিত আছে, “যারা আল্লাহ ও কেয়ামতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না এবং আল্লাহ ও রসুল (সঃ)- এর হারামকে হারাম জানে না তাদের সহিত তোমরা যুদ্ধ কর।
আর যাহারা হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম জ্ঞান করে, কেতাবের দলিল, কোরবানিকে, ৩০ পারা কোরআন শরিফকে ও কোরআনের কোন একটা অয়াতকে, পবিত্র শরিয়তের কোন একটা হুকুমকে অমান্য করে এবং যদি বলে আমাদের নামাজের দরকার নাই, নামাজ সরাইয়া রাখ, শরিয়তের আলেম ও এলেম, ফতোয়া ও ছগিরা-কবিরা গোনাহকে তুচ্ছ বলিয়া জানে, হায়েজ অবস্থায় স্ত্রী সহবাসকে হালাল বলিয়া যানে, কেয়ামত, বেহেস্ত ও দোজখ এবং পয়গম্বর (সঃ) ও তাঁহাদের খোদার নিকট থেকে আনিত বস্তুকে অবিশ্বাস করে, তাহারা মোছলমান গণের অনুরূপ নহে”” |
শামী, বাহরায়েক প্রভৃতি কেতাবে লিখিত আছে, “কোন মোছলমান মোরতাদ (উপরের মতের বাউল বা ন্যাড়ার ফকির) হইলে তাহার স্ত্রী তালাক হইবে। এদ্দতের পর তাহার স্ত্রী নিজ ইচ্ছায় পুনরায় নিকাহ করিতে পারিবে। মোরতাদ অবস্থায় কোন সন্তান হইলে তাহা হারামজাদা হইবে” ।
একবার এক সাহাবী (রাঃ) আঃ হয়রত (সঃ) কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘হে নবী (সঃ), আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কেন শেষ নবী ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে মনোনীত করেছেন?” । এর উত্তরে হুজুর পাক (সঃ) বলেন, ‘ ……. মাত্র একটি কারণেই এই সম্মান ও গুরু দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করা হয়েছে। ত হল, বাবা আদম (আঃ) থেকে আমার বাবা অব্দুল্লাহ পর্যন্ত কোন জেনা, কুফরী কাজ ও দ্বিত্ববাদ বংশ পরম্পরা কারও মধ্যে ছিলনা।
অথচ বাংলার বাউল-ন্যাড়া সম্প্রদায় ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ দোহাই দিয়ে অবাধে পরনারী ভোগের মাধ্যমে সমাজের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী ও খাঁটি ঈমানদার হতে চায় । মোরতাদ কাফেরদের পক্ষেই এটা সম্ভব ।
পবিত্র সুরা বাকারা, আল-এমরান, আল-আম, কাফ, আল-মুলক প্রভৃতিতে বর্ণিত আছে যে, “মহান আল্লাহ বলেন, হে মুসা, কখনই আমাকে দেখিতে পাইবে না। আমাকে কেহই চর্ম চক্ষে দেখিতে পাই না বটে-কিন্তু আমি সকলকেই দেখিতে পাই”। তবুও মুসা (আঃ) খোদাকে দেখিতে বাসনা করেন ।
ইহাতে ৭০ হাজার পর্দার আড়াল থেকে সূচাগ্র পরিমাণ খোদার আরশের তজল্লি মাদায়েন পাগাড়ের উপর পতিত হয় । সংগে সংগে মুসা (আঃ) ২৪ ঘণ্টা যাবৎ অচৈতন্য হয়ে পড়েন। এবং পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যায়। যার আরশের তজল্লিতে দুনিয়া ছারেখার হয়ে যায়, নবী-রাসুল অচৈতন্য হয়ে যান, অথচ চিমটাধারী, জটাধারী এই পাপিষ্ঠদের ৩২ রঙ্গের আঁচলা ঝোলার মধ্যে সে নুর বাঁধা থাকে এবং চর্ম চক্ষে খোদাকে দেখে থাকে ।
বড়ই ভাগ্যের কথা বটে। মোরতাদ কাফের ছাড়া এরূপ ভাগ্য আর কাদের হতে পারে। অতএব উক্ত বাউল ফকিরদের আকিদা, বিশ্বাস, কার্য-কলাপ, উক্তি, আচার-আচরণ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তারা সম্পূর্ণ রূপে ‘মোরতাদ কাফের’। এদের সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন, “হে নবী, তুমি যদি তাহাদের (কাফেরদের) জন্য সত্তর (অসংখ্য) বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তাহাদের ক্ষমা করিব না ” ১১ ।
অতএব, ঐসব মল, মূত্র, রক্ত, রজঃ, বীর্য ভক্ষণকারী মোরতাদ-কাফেরদের সাথে কোন প্রকার সম্বন্ধ করা, মেলামেশা করা বা তাদের আয়োজিত কোন অনুষ্ঠানে যোগদান করা বা তাদের সামান্য সংস্পর্শে আসা হারাম হারাম।
আরবি ভাষায় একটা প্রবাদ আছে, ‘মান আরাফাহ নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রব্বাহু” । ন্যাড়ারা এ বাক্যটিকে কোরআন বা হাদিস বলে প্রচার করে অপব্যাখ্যা করত: অশিক্ষিত লোকের কাছে নাম জাহির করে। এর প্রকৃত অর্থ, ‘যে ব্যক্তি স্বীয় ব্যক্তিত্ব ও হাকিকত সম্বন্ধে অবগত সে খোদার হাকিকত সম্পর্কে অবগত হইতে পারে। কিন্তু তারা অপব্যাখ্যা করত: অর্থ করে যে, ‘মানুষের বীর্যই হলো খোদা। যে ব্যক্তি এই বীর্যকে চিনিতে পারিবে সে খোদাকে চিনিতে পারিবে ।
বাউল ফকিররা বলে থাকে যে, পারস্যের সুফিজম ও বাংলার বাউল নামে পরিচিত ধর্ম একই । কিন্তু পারস্যের ‘সুফি’ সমাজের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, এই দুই মতবাদ এক নয় । এখন দেখা যাক উভয় মতবাদের তত্ত্বকথা ও মূল বৈশিষ্ট্য কি? বাউল সম্প্রদায় নিজেরা দরবেশ, ফকির, গোসাই, সাঁই, বাবা, গুরুজি, সাঁইজি প্রভৃতি নাম ধারণ করে। গুরু চরণে ‘ফানা ফিল্লাহ’ হওয়া সেই পরমাত্মাকে পাওয়া-অধরাকে ধরা । বাউল ফকিরদের বিশ্বাসে বাউল কবি পাঞ্জু শাহের পথে দেখা যায়-
“দুনিয়ার বন্ধুগণ, সব দেখ অকারণ,
পীরের চান্দুয়া নিচে, মুরীদের ছায়া আছে সেই ছায়া মুরীদ পাইবে।
আখেরে মুর্শিদ তরাইবে। গুরুকে ভজনা কর, পার পাবা পারাপার যদি মন আখেরে তরাইবে ১০
কারণ,
ইসলামের একত্বে এরা বিশ্বাসী নয়। খ্রিস্ট ধর্মের তথা কথিত বাইবেলে প্রচারিত ত্রিত্ববাদের সাথে এরাও মুরিদ, গুরু ও পরম সত্ত্বায় বিশ্বাসী। তাদের মতে, ‘খোদা ও রাসুল, গুরু রূপে প্রকাশিত । বাউলদের নির্ভরযোগ্য গুরু লালন শাহ- এর পদে আমরা দেখতে পাই-
‘রাসুল রূপে প্রকাশ রব্বানা
“রূপ ভাড়ায়ে দেশ বেড়ায়ে গেলেন সেই দয়াময়
“মুর্শিদ খোদা, ভাবলে জুদা, পড়বি প্যাচে।
যেহি মুর্শিদ, সেহি রাসুল, তাহাতে নাই কোন ভুল, খোদাও সে হয় “
এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী বাউল ফকিরগণ আল্লাহ ও তার পবিত্র কালামকেও অবিশ্বাস করে। পারস্যের সুফি মতবাদ আরবি ‘সুফ’ বা ‘সাফ’ শব্দ থেকে উদ্ভূত । যার অর্থ, পরিষ্কার, পরিছন্ন, আবর্জনাহীন, সুস্পষ্ট, অজটিল, নির্বাধ, নিষ্কন্টক, নির্মেঘ, অকপট, অন্যের অজ্ঞাতসারে, বেমালুম, সম্পূর্ণ, শর্তহীন, পরিস্কৃত, বড় নজর পশম, লক্ষ্য করা, আত্মনিয়োগ করা, পরিস্কার করা প্রভৃতি” ।
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কুফা শহরের বিখ্যাত সাধক ‘জাবির বিন হাইয়্যান’ নামক এক ব্যক্তি সর্বপ্রথম ‘সুফি’ উপাধী প্রাপ্ত হন। পরবর্তীকালে এদের ইসলামিক তাহজীব- তমুদ্দুন ও তথযুক্ত সমুদয় শাখা-প্রশাখার জ্ঞান সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এদেরকে বলা হয় ‘ফকির’। এ শ্রেণির ফকির “সুফিদের মধ্যে যিনি সর্বপ্রথম বাংলাদেশে এসছিলেন বলে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তিনি হচ্ছেন, হযরত মাওলানা শামছ তাবরিজীর শিষ্য শেখ জালাল উদ্দিন তাবরিজী ।
বাংলাদেশে সুফিদের বিশেষ প্রভাব ছিল । এঁদের সাদা-সিদা জীবন-যাপন, ধর্ম ভীরুতার ফলে দলে দলে লোক তাঁদের দিকে আকৃষ্ট হত। সুফিদের খানকা বা আস্তানায় গমন করে আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের চেষ্টা করতো। এই ভাবে সুফিদের চেষ্টার ফলে বাংলাদেশের মুসলমান সমাজ উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করে এবং মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে ”” ।
এ মতবাদের মূল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফকির শব্দের অর্থ হল ‘ফানাফিল্লাহ’ অর্থাৎ তুমি নম্রতা অবলম্বন কর। লোভ-লালসা, বাসনা-কামনা, হিংসা-দ্বেষ এবং দুনিয়াভী প্রভৃতি হীন প্রবৃত্তির কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা।
এই প্রত্যাবর্তনের জন্য তিনটি স্তর পেরোতে হয়। যথা: ১. ফানাফিস শেখ, ২. ফানাফির রাসুল, ৩. ফানাফিল্লাহ। এই স্তরগুলি পেরোতে পারলে ৪. ‘বাকাবিল্লাহ’ অর্থাৎ যেখানে মহান আল্লাহর সত্ত্বায় নিজ সত্ত্বা বিলোপ করে (একাকার হয়ে) চিরস্থায়ীত্ব লাভ করে। আর এই চিরস্থায়ী প্রেমের বিনিময় যে করতে পারে তাকেই সুফি ফকির বলা হয় ।
অতএব আমরা নি:সন্দেহে একথা বলতে পারি যে বাউল মতবাদ কোন ধর্ম মত নয় বরং তথাকথিত সাধনার ভ্রান্ত ধারা মাত্র। রং-তামাশা, গান-বাজনা, আমোদ- প্রমোদের মধ্যে গাঁজা-ভাং খেয়ে নেশায় মত্ত হয়ে অকর্ম-কুকর্ম দ্বারা বে-শরাহ ভাবে পর গৃহের প্রতি লোভ করার একটা সংস্থা মাত্র। অতএব শরিয়ত পন্থিদের নিকট বাউল মতবাদ সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও হারাম পথ ।
বাউল মতবাদ এমন একটা সাধনার ধারা যার দ্বারা মানুষ আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরে যায় ও মোরতাদ কাফেরে পরিণত হয়। অপর পক্ষে, পারস্যের সুফিজমের সাধনার ধারা, যার দ্বারা মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং মানুষকে ইসলামি প্রভাবে প্রভাবান্বিত করে। এখন দেখা যাক, নাড়া বা বাউল মতবাদীদের মধ্যে কিভাবে এসব উদ্ভট, কাল্পনিক ও শয়তানী কু-কর্ম প্রবেশ লাভ করেছে।
ইসলাম নতুন করে জন্ম লাভ করার পর থেকে পাশ্চাত্য সভ্যবাদীরা ইসলামের উপর উপর্যপরি নগ্ন হামলা, কোরআন-হাদিসের বানোয়াট ব্যাখ্যা এবং উদ্ভট কল্পনা প্রসূত অর্থ করে এ পবিত্র সত্য ধর্মকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চেষ্টা করে । তারা নিজেদের মনগড়া কথা কোরআন-হাদিস বলে অশিক্ষিত ও ধর্মভীরু মুসলমানদের মধ্যে চালিয়ে দেয়। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি ও নিজেদের কু- কীর্তি কর্মগুলোকে সত্য বলে প্রকাশ করে।
ইসলাম গ্রহণের ছদ্মবেশে এক নতুন মতবাদ সৃষ্টি করে, যা আমাদের দেশে ছিল না । এই মতবাদকে ‘বাউল ধর্ম’ বলে আখ্যা দেয় । ‘অহিংসা পরমধর্ম’ এই মতের দোহাই দিয়ে পর গৃহে ইন্দ্রিয় সুখের মাধ্যমে কথাকথিত মারফতি এলম লাভ করাই এ সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য। তারা সাধারণত: যেসব উক্তি প্রচার করে ও যার প্রভাবে সরল ও ধার্মিক লোকদের কু পথে নিয়ে যায় সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-
১। আ. হযরত (সঃ)-এর ওফাতের পর মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশকারী ইয়াহুদি, অগ্নিপূজক ও খ্রিস্টানগণ হযরত আলী (রাঃ)-কে সমর্থন করার অজুহাতে যে দল সৃষ্টি করে, ইতিহাসে এরা শিয়া নামে পরিচিত । এদের সাথে আলী (রাঃ)-এর কোনই সম্পর্ক ছিল না । তিনি এদেরকে মৃত্যু দণ্ডাদেশ দেন। কিন্তু শয়তানের শেষ করা বড়ই কঠিন। পলাতক সদস্যরা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ভারতীয় হিন্দুদের সহায়তায় ইমলামি কৃষ্টি কালচার ও মুসলিম রাজ্য ধ্বংসের চেষ্টা করতে থাকে।
তারা হিন্দুদের বুঝায় যে হযরত আলী (রাঃ) বিষ্ণুর ১০ম অবতার। এ দলের খ্রিস্টানগণ বলেন যে, হযরত ইসা (আঃ)-এর পর যে মহাপুরুষের আবির্ভাবের কথা বলা হয়েছে তিনি হযরত আলী (রাঃ)। এ কথা বলে হিন্দু ও খ্রিস্টানবৃন্দকে দলে ভেড়াতে চেষ্টা করে ।
এই দলের জনৈক মিশরবাসী জাফর ইবনে আহম্মদ ইবনে আলী অদ্ভুদ এক হাদিসের অবতারণা করে বলেন যে, “আমি (রাসুল) ও হযরত আলী (রাঃ) একই নূরে সৃজিত হইয়াছি। ৪০ পারা কোরআনের মধ্যে ১০ পারা আলী (রাঃ)-এর নিকট অবতীর্ণ হয় । আমি (রসুল) ইলমের শহর ও আলী উহার দরজা ২১
২। খ্রিস্টানদের কথাকথিত বাইবেলে দেখা যায়, “যদি কেহ মনে করে যে, সে আপনার কুমারী কন্যার প্রতি সংগত আচরণ করিতেছে না, যদি তাহার ইন্দ্রিয় বৃত্তি বৃদ্ধি পায়, আর যদি তাহার প্রয়োজন হয়, তবে সে যাহা ইচ্ছা তাহা করুক, ইহাতে তাহার পাপ নাই”২২ ।
৩। কাশীরাম দাস রচিত মহাভারতের ৮৫ পৃষ্ঠায় লিখিত আছে, মহারাজ পাণ্ডু স্বীয় পত্তী কুন্তী দেবীকে বলেন–
“পূর্বেতে আছিল কুন্তী এসব নিয়ম ।
যারে ইচ্ছা তারে করিবে সংগম
ইচ্ছামত স্ত্রীগণ যাইত তথাস্থানে ।
না ছিল বিরোধ কিছু ব্রহ্মার সৃজনে
৪। বাৎসায়ন নিম্নশ্রেণির লাটদের সম্বন্ধে অত্যন্ত ঘৃণার সাথে বলেন, “লাটদেশের (দক্ষিণ গুজরাট, ভারত) লোকদের মধ্যে ঊরুসন্ধি, বাহুমূল এবং নাভীমূলে চুম্বনের রেওয়াজ আছে। এছাড়া স্ত্রীলোকের ‘সম্বাদযন্ত্র ও পুরুষের সাধন যন্ত্র চুম্বন ও মুখমেহনের রীতিও লাটদের মধ্যে প্রচলিত””
৫। চৈতন্য ভক্ত বৈষ্ণবদের মধ্যে এই বিশ্বাস আছে যে, ‘গুরুকে ভক্তি করলে সব কিছু বিশেষ করে প্রেম ও কাম পাওয়া যায় । যেমন-
“গুরু ভক্তি বিনে যদি ব্রত যোগধ্যায়,
প্রেম কাম নাহি মেলে সব ব্যর্থ যায়
৬। আত তারিকুল কামেল, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৪৮ পৃষ্ঠায় ও আশ্ শায়রাত ইবনুল ইমাদ গ্রন্থের ২য় খণ্ড, ২৯০ পৃষ্ঠায় লিখিত আছে যে, “মুর্শিদের জন্য মুরীদের স্ত্রীকে ব্যবহার করা বৈধ। মানুষের বীর্য হইলো নূর, তাই মুরীদের স্ত্রীদের শরীর অভ্যন্তরে ইহা প্রবেশ করানো আর নূর প্রবেশ করানো ছাড়া আর কিছুই নয়” । মনসুর হাল্লাজের অনুসারী শালমাগানী এই উক্তি করেন ।
৭। আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া গ্রন্থ, ১১শ গ্রন্থ, ১৭৯ পৃষ্ঠায় লিখিত আছে, “হাল্লাজ তাহার পুত্রবধুর সহিত যৌন ক্রিয়া চালাইবার চেষ্টা করে। হাল্লাজ তাহার পুত্রবধুকে আহ্বান করিয়া বলে যে, হাল্লাজের সহিত তাহার মিলন তাহার জন্য এবাদত হইবে”” ।
৮ হিন্দু শাস্ত্রে লিখিত আছে যে, “অন্তর্যোগং শশ্বদভজতাং অন্তে মোক্ষ: স্ত্রী সঙ্গাচ্চ হিংসা ধর্ম ‘পানংসুকৃতংগুপ্ত মুক্ত’ প্রকটো ভ্ৰষ্ট” ।
অর্থাৎ “যাহারা সর্বদা ব্রহ্ম উপাসনা করে, তাহারা মৈথুন (নারী সংসর্গ) দ্বারা অবশেষে পরিত্রাণ পায়। তাহাদের পক্ষে জীব অহিংসা ও মদ্যপান পুণ্য কাম। তাহারা ইহা প্রকাশ করিলে ভ্রষ্ট হয় ও গোপন করিলে মুক্তি পায়”৮ ।
৯। শ্যামা রহস্যে লিখিত
“মদ্যং মাংসঞ্চ মুদ্রা মৈথুন সেবচ ।
ম-কার পঞ্চক বৈষ্ণব মহাপাতক নাশনা” ।
অর্থাৎ “মদ্য, মাংশ, মৎস, মুদ্রা (মুড়ি) এবং মৈথুন এই পাঁচটি ম-কার দ্বারা মহাপাপ দূরীভূত হয়।
১০। মনু শাস্ত্রের (সংহিতা) এক স্থানে এরূপ দেখা যায়, অর্থাৎ, “শাস্ত্রানুসারে মাংস খাইতে, মদ্যপান করিতে ও স্ত্রী সংসর্গ করিতে দোষ নাই
১১। ভগবত গীতায় দেখতে পাওয়া যায়,
“অসত্যম, প্রতিষ্ঠাং তে জগদাহুর নীরশ্বরম ।
অপরষ্পর সম্ভূত কিমন্যং কাম হৈতুকম”
অর্থাৎ “এই সব জগত মিথ্যা (কাহারও আশ্রয়ে অবস্থিত নহে) বেদ- পুরাণাদি সবই অসত্য এবং মিথ্যা, জগতে ধর্মকর্মের ব্যবস্থাও নাই (ধর্মাধর্মের বিধানকর্তা বা সৃষ্টিকর্তা বলিয়া কেহ নাই), ইহা কেবল স্ত্রী- পুরুষের কাম সংসর্গ হইতে জাত, ইহার অন্য কোন কারণ নাই, কেবল কাম প্রবাহ হইতে উৎপন্ন ১।
১২। লেনিন রাশিয়ান তথা বিশ্বের জনগণকে আহবান করে বলেন, “বন্ধুগণ, তোমাদের ঐসব (ধর্ম) কুসংস্কারকে বর্জন কর। শ্রমিক শ্রেণির শক্তি কোন ঈশ্বরের নিকট হইতে আসে নাই। ঈশ্বর সম্বন্ধে বহু ঝুটি কথা শুনিয়াছি। ঐ আফিম আর খেতে চাই না। ঈশ্বর বলে পৃথিবীতে বা স্বর্গে কেহ নাই” ।
১৩। রিজাল শাস্ত্রের বিখ্যাত কিতাব ‘লিসানুল কিতাব’ ১২৩০ হিজরিতে হায়দ্রাবাদ থেকে প্রকাশিত হয়। উহার ৪র্থ খণ্ডের ৩১৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, “খোদা নারী রূপে পৃথিবীতে বিভিন্ন দফায় যাওয়া-আসা করে ৭৪ ।
১৪। এক শ্রেণির খ্রিস্টান পাদ্রি আছে, যারা বিয়ে না করে সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফাদার’ উপাধি লাভ করে। এবং তত্ত্বাবধায়ক রূপে চার্চে আগত সেবিকাদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে। ফাদারের সাথে যুবতীদের যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে তারা আলোক প্রাপ্ত হয় । প্ৰভু যিশুত তাদের প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট থাকেন। কারণ, “তারা একে অপরের উপর রহম করিল
১৫। খ্রিস্টানদের তথাকথিত পবিত্র বাইবেলে খাদ্য সম্বন্ধে লিখিত হয়েছে যে, “শুন এবং বুঝিয়া লও মুখের মধ্যে যাহা প্রবেশ করে তাহা মানুষকে অপবিত্র করে না |
১৬। বাউল কুল শিরোমনি লালন শাহ-এর কবিতাবলিতে আমরা দেখতে পায়,
“নবী আদম খোদ বুদ খোদা, এ তিন কভু নহে জুদা,
আদমে করিলে সেজদা, আলেক জনা পাই”
“জীবে আত্মা পরম আত্মা, ভিন্ন ভেদ জেন না””
“ইবলিমের সেজদার ঠাঁই ছেড়ে চাই সেজদা করা”
” “মিছে কেবল জাতের কথা, ঝগড়া কেবল যথা-তথা,
লালন বলে জাতের কথা, ডুবাইয়াছি সাধ বাজারে”।
“কেবল বিধি লেখে জীবন মরণ, মিথ্যা এসব মুখের বচন”
এমনই ধরনের আরও বহু লালন পদ রয়েছে যে এরা না দেখে কোন কিছুতেই বিশ্বাস স্থাপন করে না। ‘ঘোড়ার ডিম’ শব্দটা যেমন আভিধানিক একটা শব্দ মাত্র, তেমন-ই আভিধানিক শব্দ হলো- আল্লাহ, ফেরেশতা, জ্বিন, কেয়ামত, বেহেশত, দোজখ, আসমান প্রভৃতি। রব্বুল আ’লামিন-এর পুরুস্কার ও সাজা- শাস্তি, লোভ ও ভয় দেখানোর নামান্তর মাত্র। এবং তৎপন্থি সকলের পদেই তার প্রমাণ মেলে।

এতক্ষণে যে আলোচনাগুলি করা হল তাতে বুঝা যায় যে, একমাত্র যৌন লাভের বশবর্তী হয়েই মানুষ তার সবথেকে মূল্যবান সম্পদ জলাঞ্জলি দিতে পারে। মুরতাদ কাফের বাউল সম্প্রদায়ের পক্ষে এটাই সম্ভব । এক কথায় আমরা বলতে পারি যে, “প্রেমময় জগতে নারী হইতেছে প্রেমর মূল দিশারী।
উহা সকলের জন্য সমভোগ্য নিয়ামত ভোগবিলাসী বাউলগণ মজুসী, হিন্দু, ও খ্রিস্টান জাতির উচ্ছিষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয় । চারণ কবি পাগলা কানাই-এর ধর্মমত আলোচনা করতে যেয়ে তৎকালীন বাউল সমাজের মোটামুটি একটা আলেখ্য চিত্রায়িত হলো। এক্ষণে দেখা যাক কবির ধর্মমত কিরূপ ছিল ।
কবি পৌত্র জনাব ইমদাদুল হক সাহেব বলেন, “আমার দাদা হুজুর পীর কেবলা কেবল মাত্র কাদরীয়া তরিকার একজন খাঁটি মুসলমানই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ফকিরে কামিল-একজন আল্লাহর ওলি”*২ ।
ড. মযহারুল সাহেব তাঁর ‘পাগলা কানাই’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “ধর্ম বিশ্বাসে কবি পাগলা কানাই শুধু নামে মাত্র মুসলমানই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দরবেশ জাতীয় মুসলমান । আমরা কবি শিষ্য, পালি দোহার ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিবর্গ ও শ্রুতিনুযায়ী জানতে পারি, “পাগলা কানাই ছিলেন খুব নামাজী । আক্ষরিক জ্ঞান না থাকলেও তিনি ছিলেন অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। নামাজের সময় হলে তিনি গান থামিয়ে নামাজ আদায় করতেন । শরিয়তের প্রতি তার ছিল পূর্ণ ভক্তি ও শ্রদ্ধা” ।
তৎকালীন বাউল মতবাদের দৌরাত্ম্য তাঁর জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে নি । বহু ফকির কবির সংস্পর্শে এসেছে। তারা অনেকেই পাগলা কানাই-এর আদর্শ ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তাঁর যুগে তিনি ছিলেন আলাদা একটা সত্ত্বা-একটা নক্ষত্র । এ সম্পর্কে একজন ধুয়া সাধক তাইজদ্দি মোল্লাহ্ বলেন,
“আরে ও পাগলা কানাই আগে গিয়েছে,
খোদ হাকিমের সামনে খাড়া রয়েছে ।
এ দেশে কানাইয়ের সংগে যারা পারতো না।
কানাই’র সংগে সাথে আছে। ডিক্রি করা কানাই’র হাতে,
আদালতে পড়ে যাবে ধরা। তারা পারবে না কেউ কানাই’র সাথে,
তার হাতে আছে ডিক্রি করা ।
পাগলা কানাই ছিলেন চারণ কবি। গানের মাধ্যমে তিনি দেশে-বিদেশে ভ্রমণ করে বেড়িয়েছেন সত্য, কিন্তু তার মধ্যে ইসলামি জীবনাদর্শ পুরোমাত্রায় বিদ্যমান। ছিল । আল্লাহর একত্ব তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন,
“তাই পাগলা কানাই কয়, ওগো মালেক সাঁই,
তুমি লা-শরীকালা, তোমার শরীকদার কেউ নাই””” ।
কবি ছিলেন শরিয়তের একনিষ্ঠ পা-বন্দ। অত্যন্ত ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে তিনি সেগুলি পালন করতেন । শরিয়তে পূর্ণ বিশ্বাসী কবি বলেছেন-
“শোন ভাই মোমিনগণ,
করো এই আকবতের কাম-বেলা গেল ।
গাফিলেতে বসে আছো? গা-তোল গা-তোল ।
ঐ দেখ মাগরিবের ওক্ত হয়েছে,
এ সময় নামাজ পড়া।
“রোজা নামাজ সংগের সাথী,
অন্ধকারে গোরের বাতি।
তাই বুঝিয়া খোদার বান্দা করো শরিয়তি
“আর ৩০ রোজা পঞ্চমতি, তাই পড়িলে হবে গতি
সে হবে তোর সংগের সাথী
ওরে রোজ হাসরের ময়দান পরে, হিসাব নিবেন আল্লাজি
“মানুষ যত উন্নত এবং শক্তিশালীই হোক, তাহার মধ্যে পঞ্চেন্দ্রিয়ের চেতনা বিদ্যমান থাকা আদৌ অস্বাভাবিক নয় । কোন জীবই এর থেকে রেহায় পায় না বটে, কিন্তু জ্ঞানবান মানুষ সে চেতনা সম্পর্কে পূর্বেই সাবধান হয়ে থাকে। তাই কবিও সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন-
“কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মায়া যার অন্তরেতে নাই,
তারই হচ্ছে সাধন ভজন, এই অধীনের শক্তি নাই
পবিত্র কোরাআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “লা-কাদ কানা লাকুম ফি রাসুলিল্লাহি উস ওয়াতুন হাসানা” । অর্থাৎ, “নিশ্চয় আল্লাহর রসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য একটি উত্তম আদর্শ রয়েছে। কবিও এই আদর্শকে মনে প্রাণে ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করেন । তাঁর কবিতাবলীতে আমরা দেখতে পাই-
“দ্বীনে দীন মহম্মদের দ্বীন, আর কি আমার হবে।
লা-ইলাহা কলমা পড়, ইল্লাল্লাহ বলে দম ফের ছাড়ো, মোমিন সকলে**২।
“শোন মোমিন মুসলমান, পড় রাব্বিল আ’লামিন,
দিন গেলে কি পাবি ওরে দ্বীন । সেই দ্বীনের মধ্যে প্রধান হলো, মোহাম্মদের দ্বীন ।
সেই দিনের দ্বীন করে একিন, মুখে রচি চিরদিন।
মোদ্দা কথা, চারণ কবি পাগলা কানাই ছিলেন একজন একনিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। গানের জগতে তিনি খুব অল্প বয়সেই পরিচিতি লাভ করেন । প্রথম জীবনে তিনি স্বাভাবিকভাবেই বাউল শ্রেণির ফকিরদের সাথে মিশেছিলেন। তখন মাথায় বাবরী চুলও ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী কাঙাল হরিনাথ বলেন, “লোকে লোকারণ্য, চেয়ে দেখি পাগলা কানাই ও ৮/১০ জন লম্বা লম্বা চুল ওয়ালা লোকের সাথে করে আল্লাহ আল্লাহ ধ্বনি করে আসরে প্রবেশ করলেন এই প্রত্যক্ষদর্শীর উক্তি মোতাবেক বলা যেতে পারে নিছক বয়সের গুণেই তাঁর মাথায় বাবরী চুল ছিল । কিন্তু মুখে সর্বদায় আল্লাহর নাম বিদ্যমান ছিল ।
*পরবর্তীকালে তিনি এই চুলের অসারতা অনুভব করেন এবং বাউল ফকিরদের থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে মুক্ত করে সুন্নতি লেবাস গ্রহণ করেন ” । আর চিরদিনই তিনি পূর্ণ শরিয়ত-পছি মোসলমানি তাহযিব-তমুদ্দুনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে ছিলেন ।এতক্ষণ, উল্লিখিত আলোচনার আলোকে আমাদের নিকট এটাই প্রতিভাত হয়। যে, চারণ কবি পাগলা কানাই তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি পাতায় পাতায় শরিয়তের একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন। ইসলামি জীবন বিধানই ছিলো তাঁর পথ প্রদর্শক।
“আমি তোমাদের জন্য দুইটি বস্তু রাখিয়া যাইতেছি, তা হলো, কোরআন ও হাদিস” এই বহুল প্রচলিত হাদিসটার দিকে চারণ কবি পাগলা কানাই-এর দৃঢ়তা ও আস্থা সত্যই প্রশংসনীয়। আর এই বিশ্বাসের ফলেই তিনি নামাজের সময় হলেই হাজার হাজার অপেক্ষমান সংগীত পিপাসু শ্রোতা মণ্ডলীর মাঝেই নামাজ আদায় করতে পারতেন। এখানেই অন্যান্য বাউল ফকিরদের সাথে তাঁর পার্থক্য । তিনি মহান আল্লাহকে আত্মোপলব্ধি করার মাধ্যমে জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।
এবং তারই কাছে তিনি সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। দুনিয়ার আর কারও কাছে নয় । এতে সহজেই বুঝা যায়, তার মতো একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পক্ষেই এটা কারণ, “যে অদৃশ্য শক্তির হাতের পুতুল আমরা, সেই অনন্ত অপরিমাণ শক্তি যে উৎস হতে উৎসারিত হচ্ছে, সেইখানে খোঁজ পরম ঐশ্বর্যের সন্ধান লিডারের কাছে শক্তি ভিক্ষা করো না, এতে আল্লাহ নারাজ হন। শক্তি ভিক্ষা করো একমাত্র আল্লাহর কাছে । মহিমা কীর্তন করো একমাত্র আল্লাহর কাছে |
চারণ কবি পাগলা কানাই-এর সম্ভাব্য কাল
যে কাজ আমাদের মনকে আনন্দিত-আমোদিত করে তাকে শিল্প বলে । আর যে শিল্প আমাদের আনন্দানুভুতি জোগায় তাকে সংগীত বলে । এবং যে সংগীত ‘নৃত্য, গীত এবং বাদ্য’-এই তিনের সমন্বয়ে সুর-ব্যাঞ্জনার সৃষ্টি করে তাকেই স্বার্থক সংগীত বলা হয় । এসব স্বার্থক সংগীত রচয়িতাগণ প্রকৃতি ও মানব মনে স্বীকৃত হয়ে রয়েছেন
একাত্মভাবে। সে কারণেই আমরা সে সব রচয়িতাগণের পরিচয় জানতে আগ্রহী হই ।
কালের ব্যবধানকে পাড়ি দিয়ে যে প্রতিভা আজ বাংলার আনাচে-কানাচে, গ্রাম বাংলার মানব হৃদয়ে প্রাণবন্ত হয়ে আছে, সে প্রতিভা বাংলার গৌরব ‘চারণ কবি পাগলা কানাই” । সমগ্র বাংলার বিশিষ্ট কবিদের মধ্যে সর্বজন স্বীকৃত ধুয়ো- জারি’ গানের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা, গায়কই শুধু নন, মুখ্যত তিনি একজন উঁচু দরের মরমী সাধক ও কবি ।
তার মতো শক্তিশালী ও প্রতিভাবান কবি সম্পর্কে জানার আগে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে তিনি কোন যুগের মানুষ? আমরা এ অধ্যায়ে তার সম্ভাব্য ‘জন্ম-মৃত্যু’ তারিখ নিয়ে আলোচনা করতে চাই ।
পূর্ব প্রকাশিত বহু পত্র-পত্রিকা বা পুঁথি-পুস্তকে কবির জন্ম-মৃত্যু সম্পর্কে যে সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আমাদের মতে তার একটিও স্পষ্ট ও সঠিক নয় । তবে তাদের অনুসন্ধিৎসু মন অনেক দূর পর্যন্ত অগ্রসর করেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। সম্ভবত, তাদের নিকট উপযুক্ত তথ্যাদি না থাকায় সঠিক সময় কাল নির্ণয় করা সম্ভব হয় নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার পূর্বে দেখা যাক কে কি বলেছেন,
১। “মেহেরুল ইসলাম’ বইয়ের পাদটীকায় শেখ জমিরুদ্দীন বিদ্যাবিনোদ সাহেব লিখেছেন-“জেলা যশোরের পশ্চিম কোনে তিনমাইল দূরে বেড়বাড়ি নামক পল্লী। এই বেড়বাড়িতে কানাই বয়াতির জন্ম স্থান ১২৯৬ সালের ২৮শে আষাঢ় প্রায় ৬৫ বছর বয়সে তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে”।
২। “কবির জন্ম-মৃত্যুর সম্ভাব্য সময় যুক্তি-তর্কের সাহায্যে আমি যা উল্লেখ করেছি তা যথার্থ না হলেও সত্যের কাছাকাছি মনে করা যেতে পারে। কবি ১৮১০ থেকে ২০ খৃস্টাব্দের মধ্যে জনগ্রহণ করেন ও ১৮৯০/৯৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে পরলোক গমন করেন”।”
৩। অধ্যাপক জনাব মনসুর উদ্দিন সাহেব বলেন, “তিনি (পাগলা কানাই) সম্ভবত ১৮২০ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। খুব সম্ভবত ১৯০০ খৃস্টাব্দে পরলোক গমন করেন।
৪। অধ্যাপক জনাব মকবুল হোসেন বলেন, “কবি পাগলা কানাই-এর মৃত্যুকালকে অবলম্বন করে তাঁর জন্মকাল ১৮১০/১৫ খৃস্টাব্দে এবং মৃত্যু সময় ১৮৯০ খৃস্টাব্দ অর্থাৎ ১২৯৬ খৃস্টাব্দের ২৮শে আষাঢ়”
৫। কবি পৌত্র জনাব এমদাদুল হক সাহেব বলেন, “বাংলা ১২০৯ সালের ২৫শে ফাল্গুন রোজ সোমবার ‘বেড়বাড়ি’ গ্রামে শেখ পরিবারে আমার দাদা পীর সাহেব তশরীফ আনেন এবং বাংলা ১২৯৯ সালের ২৮শে আষাঢ় শুক্রবার ৯০ বছর বয়সে নিজ গ্রামে মানব লীলা সাঙ্গ করেন” আমরা নিম্নের মন্তব্যটিকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি। এখন যুক্তি দ্বারা আলোচনা করে দেখা যাক কোন মন্তব্যটি গ্রহণযোগ্য।
এখানে বলা প্রয়োজন যে, আমরা কবির জীবন, কর্ম ও তার রচনাবলী, সমকালীন লোকের মন্তব্য, শিষ্যবৃন্দের উক্তি, জনশ্রুতি প্রভৃতি বিচার করে সঠিক সময় নিরুপণের চেষ্টা করবো । কারণ, যথোপযুক্ত প্রমাণাদী ছাড়া কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না ।
‘মেহেরুল ইসলাম’ বইয়ের পাদটীকায় যে সনের উল্লেখ আছে তা আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। চারণ কবি পাগলা কানাই যে অতি বৃদ্ধ বয়সে লোকান্ত রিত হন তা আমরা তার কবিতাবলির মধ্যেই দেখতে পায় এবং এটা সর্বজন স্বীকৃতও বটে। বৃদ্ধকাল বলতে কত বছর বয়স ধরা যেতে পারে? গ্রামীণ পরিভাষায় ‘বুড়ো ঝুনো’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।
আবার ‘আশি বছর’ পার হলে তাকে রহস্য করে বলা হয়, ‘আশি সালের লোক, কি বুঝবে বর্তমান কালের?’ তাহলে অতি বৃদ্ধকাল বলতে ৮০ বছরের উর্দ্ধের বয়সকে ধরা যেতে পারে । কবি যে এ বয়সেও গান করে বেড়িয়েছেন তার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যায় । অতএব, অতি বৃদ্ধকাল বলতে আমরা ধরে নেব কবির বয়স অন্তত ৮০ বছর ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কবি তার বয়সের প্রতি যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তাতেও একথা প্রমাণ মেলে। যেমন-
“এখন হইছি ভাটি, ভর দিই লাঠি, দত্তগুলি পড়েছে।”
ঘরের বেড়া নাইরে আমার, না’ল পড়ে বুঝি ।
চোকি আমার ঘোম আসেনা, ভুন ভুনায় মাছি।
রাত দিন আমার হাত আজোড় নেই, চোখির ক্যেতত্ত্ব মুছি।”
“রথ নতুন কালে ছিলো ভালো দেখতে পরিপটি ।
ওর বোলন গিয়েছে আড়ো হয়ে আড়িয়ে গেছে ধর্ম-ঘরার খিল কাঠি।”
“ওরে জোয়ান কালে ছিলাম ভালো, বল ছিল মোর হাটুতি,
ষোল চুঙোর বুদ্যি কানাই’র গেল, এক চুঙোর মদ্যি।”
“কেউ বলে ভাই এক কর্মে লাগে, হয় লাঙলের মুড়ো ।”
এ সব কবিতার দিকে লক্ষ করলে সহজেই অনুমিত হয় যে, কবি অত্যন্ত বৃদ্ধকাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন এবং তখনও গান করে বেড়াতেন। মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বেও তিনি পাবনা জেলায় গান করতে যান, সে প্রমাণ ড. মযহারুল ইসলাম সাহেব করেছেন। এ সময় কবির এত বেশি বয়স হয়েছিল যে, সাধারণ লোকে বিশ্বাস করতে পারতো না কবি আজও বেঁচে থাকতে পারেন। কবির ভাষায় দেখি-
“ভাইরে এই উত্তর দেশে আসে,
পাগল কানাই বেড়াচ্ছে ভাসে,
ওর রূপ দেখে সব লোকেতে হাসে।
কেহ কেহ বলে ভেদু ছিল কোন দেশে?
আজও তো মরিনি বা’চে আছে।”
অতএব জনাব বিদ্যাবিনোদ সাহেবের সন বিশেষ করে উল্লিখিত ৬৫ বছর বয়স একেবারেই অযৌক্তিক। কারণ, এ মতানুসারে ১২৯৬ কবির মৃত্যুসন ধরা হলে জন্ম সন ধরতে হয় ১২৩১ সাল । এখন কবি যদি ১৫ বছর বয়সেও গান রচনা করা শুরু করেন, তবে তার প্রথম আসর গীতি ধরতে হয় ১২৪৬ সালে। অর্থাৎ, ১২৩৬ সালে নলডাঙ্গার রাজা শশী ভূষণ দেব রায়ের রাজ্যাভিষেকের সময় কবির বয়স হয় মাত্র ৫ বছর।
কিন্তু কবি পুত্র বাছের আলী শেখ, পৌত্র ইমদাদুল হক, ফটিক আলি, কবি শিষ্য ও জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, চারণ কবি পাগলা কানাই ও রাজা শশী ভূষণ দেব রায় প্রায় একই বয়সের লোক ছিলেন এবং উভয়ের মধ্যে সখ্যতাও ছিল যথেষ্ট।
“রাজার রাজ্যাভিষেকের সময় (১৮৩০ খ্রি.) আয়োজিত গানের জলসাতে কবি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে পাল্লা করেছিলেন”। এই সময় গানের জগতে একবারে নতুন হলেও অল্প বয়সে কবি যে পান্না গায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন তা সকলেই স্বীকার করেন । অতএব বিদ্যাবিনোদ সাহেবের উল্লিখিত ৬৫ বছর একবারেই অনুমান মাত্র ।
এরপর আসা যাক ড. মযহারুল ইসলাম সাহেব এবং অধ্যাপক মকবুল হোসেন সাহেবের কথায় । তাঁরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন সত্য, তবুও কবির জন্ম- মৃত্যুর সন-তারিখের স্পষ্টতায় সন্দেহের দোলে দোল খেয়েছেন। অধ্যাপর সাহেব ড. সাহেবের সুরে সুর মিলিয়েছেন মাত্র ।
তাঁরা সুষ্ঠু সিদ্ধান্তে আসেন নি ড. সাহেব ফরিদপুর জেলার এক মেলায় কবিকে স্বচক্ষে দেখতে পাওয়া কাঙ্গাল হরিনাথের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, তখন কবির বয়স অনুমান ৭০ বছর। মেলাটি ১৮৮০/৮১ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এ হিসেবে ড. সাহেব কবির জন্মসাল ১৮১০ সাল মনে করেন। কবির একটা পদে আমরা দেখতে পাই-
জৈষ্ঠ মাসের ৫ই রে ভাই তারিখ বুধবার ।
আমি পাবনা জেলার গ্রামে গেলাম-
নতুন হাট উঠাইবার।
এ গানের আলোকে ড. সাহেব বলেন যে, ১২৯০ খ্রি. কবি পাবনা জেলার উল্লাহপাড়া স্টেশনের নিকট গাড়াদাহ গ্রামের চাকদহ পাড়াতে একটি নতুন। হাটের উদ্বোধন করেন। এটা ঐতিহাসিক সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। “প্রত্যক্ষদর্শী মাতুল্লাহ প্রামাণিক জোর দিয়ে বলেন যে, সে সময় কবির বয়স ৭০/৭৫ বছর ছিল এবং এরপর কবি ৮/১০ বছর জীবিত ছিলেন” । তার কথায় যদি ধরে নেয়া যায় তবে কবির মৃত্যু সন পড়ে ১৩০০ সনের দিকে।
অথচ ড. সাহেব ১২৯৫/৯৬ সনের বেশি কবিকে জীবিত রাখেন নি। আর ড. সাহেবের এ মতামত স্বীকার করে নিলে কবি রচিত অতি বৃদ্ধ বয়সের সংগীতগুলি যা তিনি সম্পাদনা করেছেন তা মাঠে মারা যাবে। এখানে একটা কথা আমাদের মনে রাখেতে হবে যে, অত্যন্ত কঠিন রোগাক্রমনের পরও কবি ছিলেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী । অধিক বয়সেও তাঁর প্রকৃত বয়স সহজে বুঝা বা অনুমান করা যেতো না। ফলে, লোকে তাঁর বয়স সম্পর্কে নানা প্রকার কথার জাল বুনতো। এ সম্পর্কে কবির ভাষায়-
“কেহ কেহ বলে রে বিজুত ভাড়ো,
আজও জোয়ান আছে হয়নি বুড়ো?”
“কেহ কেহ বলে রে ভেদু ছিলো কোন দেশে?
আজও তো মরিনি বাঁচে আছে।”
এসব গানে স্পষ্টত প্রমাণ করে কবি দীর্ঘকাল অবধি বেঁচে ছিলেন। এ বয়সের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী কবিকে তাঁর প্রকৃত বয়স থেকে কম বয়সের বলেই মনে হতো এবং চিরাচরিত নিয়মে পাল্লা করে বেড়াতেন। অতএব অধ্যাপক হোসেন সাহেব এবং ড. ইসলাম সাহেবের উল্লিখিত সন-তারিখ আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয় ।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লোক সংগীত সংগ্রাহক জনাব অধ্যাপক মনসুর উদ্দীন সাহেবের কথায় এবার আসা যাক। বড়ই দুঃখের বিষয় যে, তিনি অসম্ভব রকমের গড়মিল রেখে যে গান সংগ্রহ করেছেন তা সত্যই অবাস্তব ও কাল্পনিক। যেমন-
“পাগলা কানাই কয় সভায় এসে, নতুন জারী করি বর্ণনা ।
নতুন আইন হচ্ছে জারী, হায় কি করি, ঐ দুঃখে প্রাণ বাঁচে না।
বান্দে ঘাটে সাড়ার পুল, সাহেব হইলো নামাক কুল,
আবার মেম সাহেবের বুদ্ধি ভারি, টানে চালায় রেলের গাড়ি জলে চালায় ইস্টিমার।
শন্যি ভরে তার টানাইয়া, করতেছে হেকমতের কারবার ।
চার মুড়ো চার চুঙ্গি গাড়া, পুল করলো খাড়া,
দেখতে খুব চমৎকার”।
“সন ১৩৩৩ সালে বাঁধছে বিষম খরা”।
এসব গান চারণ কবি পাগলা কানাই-এর বলে ধরে নিলে কবি ১৩৩৩ সাল অর্থাৎ ১৯২৭ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন ধরতে হয় । অথচ তিনি কবির মৃত্যু সাল ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ বলে মনে করেন।
পাবনা জেলার ইতিহাসে দেখা যায়, “এই ব্রিজ তৈরির পরিকল্পনা গৃহিত হবার পর স্থান নির্বাচনের জন্য ১৯০৭ খৃঃ একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়। ৭ বছর ধরে কাজ করার পর ১৯১৪ খৃঃ শেষ দিকে সমাপ্ত করা হয়। ১৯১৫ খৃঃ ১লা জানুয়ারি ডাউন গাড়ি ও ২৫শে ফেব্রুয়ারী মাল গাড়ির লাইন খোলা হয় ।
এবং সর্বশেষ লর্ড হার্ডিঞ্জ সাহেব কর্তৃক ৪ঠা মার্চ যাত্রীবাহী লাইন খোলা হয় “১” ।
অতএব অধ্যাপক সাহেবের উল্লেখিত সন তারিখ নিছক ছেলেমী ও যুক্তিহীন । আমাদের মনে হয় পরবর্তীকালে কোন লোক বা কবির কোন শিষ্য অন্ধ ভক্তির খাতিরে বা সাহসীকতার অভাবে কবির ভণিতা জুড়ে দিয়েছে। তাছাড়া বর্ণনাকারীর দোষেও অনেক সময় মারাত্মক ভুল হয়ে থাকে ।
সর্বশেষ আলোচনা করবো কবি পৌত্র ইমদাদুল হক সাহেব ও শ্রুতি প্রসঙ্গে । তিনি ১৯৮৭ খৃঃ ৮৬ বছর বয়সে মারা যান। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি কবি প্রসঙ্গে জানান, “আমি যাহা কিছু বলিলাম, উহা আমার পিতার নিকট হইতে জানা । এই সব কথা আপনাদের মনঃপুত হইতেও পারে, নাও হইতে পারে” । এখানে ‘মনঃপুত’ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে কবির জীবনাদর্শ এবং কিংবদন্তি কাহিনী সম্পর্কে।
কারণ, কবি নিজেই ছিলেন এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব। তার কর্ম-পদ্ধতি ও কর্মজীবনও যে আশ্চর্য হবে তাতে আর সন্দেহ কি? তাই তিনি বলেছেন যে, কবির বিভিন্ন বহুমুখী বিচিত্র ঘটনা বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস দু’ই হতে পারে । কবি পুত্র বাছের আলি শেখ থেকে বর্ণিত এসব সন তারিখই আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য । “তিনি ১৯৩৬ খৃঃ পরিণত বয়সে মারা যান “১১ । তার উল্লেখিত সন তারিখ ও আমাদের সংগৃহীত সন তারিখের হুবহু মিল আছে।
অতএব এ সন তারিখগুলি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি। এখন বিভিন্ন যুক্তি তর্কের সাহায্যে উপরোক্ত মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করে দেখা যাক ।
পূর্বেই বলেছি যে, চারণ কবি পাগলা কানাই বেড়বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। এসম্পর্কে প্রথম ভিন্নমত দেখা যায় কবি জসীম উদ্দিন সাহেবের ‘জারীগান’ নামক পুস্তকে।
তিনি নেবুতলা-মাধবপুর কবির জন্মস্থান বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি কোথা হতে এ তথ্য সংগ্রহ করেছেন তা স্পষ্ট নয়। আমাদের ধারণা, কবি জসীম উদ্দিন সাহেব ১৯৬৪ খৃঃ একবার বেড়বাড়িতে আসেন (লেখক তখন দশম শ্রেণির ছাত্র)। তাঁর আগমন উপলক্ষে ছোট-খাট একটা গানের আসরে কিছু লোকের সমাগম হয়। তখনও কবির মাজারে কোন স্মৃতি চিহ্ন স্থাপিত হয় নি।
আমার পিতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জনাব শামছুদ্দিন আহমেদ সাহেব কবি সাহেবকে পথে তাঁর বাড়িবাথান সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংবর্ধনা জানান। পল্লী কবিও ছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি শিক্ষকের মর্যাদা দিতে জানতেন ।
বেড়বাড়িতে অবস্থানকালে তিনি আমার পিতাকেও সংগে রাখেন। যা হোক, কবি সাহেব স্থানীয় জনসাধারন ও মৎ অলোচিত কবি বংশধরদের সংগে আলোচনা কালে একটা প্রশ্ন রাখেন যে ‘কবির পূর্ব পুরুষদের বাস যদি নেবুতলা-মাধবপুর হয়ে থাকে তবে কে, কখন, কোন সময়ে বেড়বাড়িতে বসতি স্থাপন করেন?” জানা না থাকলে এসব প্রশ্ন জটিলতার সৃষ্টি করে। হলোও তাই। জসীম উদ্দিন সাহেবের নিজস্ব ধ্যান-ধারনাই পাগলা কানাইকে বেড়বাড়ি থেকে নেবুতলায় জন্ম দেয়া হল ।
আমাদের ধারণা, কবির ভগ্নি স্বরনারীকে বিয়ে দেয়া হয় বেড়বাড়ির কামাল উদ্দিন বিশ্বাসের সংগে। তিনি কবি অপেক্ষা ১০/১২ বছর বয়স্কা ছিলেন। তৎকালের প্রধানুযায়ী অল্প ব্যাসেই তার বিয়ে হয়ে যায়। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় কবির পিতা কুড়োন শেখ এই মেয়ে জামাই বাড়ি আশ্রয় নেন। এখানেই পরী করি সাহেবের হিসেবে বিভ্রাট ঘটেছে। বোন অপেক্ষা ভাই ১০/১২ বছরের ছোট, এ সত্যটা মেনে নিলে সামাধান হয়ে যায়। কবি সাহেবের জন্ম ক্রমানুসারে নেবুলা জন্মস্থান বলে মনে করেছেন।
এখনে একটি কথা না বলে পারছি না যে, চারণ কবি পাগলা কানাই যেখানেই জন্মগ্রহন করুন না কেন, তিনি বেড়বাড়িরও নন নেবুতলারও নন। তিনি সবার সারা বাংলাদেশের-সারা পৃথিবীর। তবে আমাদের উদ্দেশ্য হলো সঠিক তথ্য উদ্ঘাটন করা। যা হোক ‘জারীগান’ পুস্তক ছাড়া আমরা অন্য কোথাও এ তথ্য সংগ্রহ করতে পারি নি । ‘কবি পাগলা কানাই’ গ্রন্থেও ডঃ মাজহারুল ইসলাম সাহেব কবির জন্মস্থান ‘বেড়বাড়ি’ উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে কবি শিষ্য খোদাবক্স বলেন-
আর এ ছল পুছতাম না রে ভাই,
তোর স্বভাব গুনে ছল পুছতে হয় ।
আবার ধুয়ো বান্দে গায়ে গেছে-
বেড়বাড়ির পাগলা কানাই ।
কবি শিষ্য ও পালিদোহার, পরবর্তীকালের প্রতিদ্বন্দী ইদু বিশ্বাস ( ইদ্রিস আলি বিশ্বাস-ঘোড়ামারা) এর গানে দেখি-
আড়োর নইমদ্দি,
বুদ্ধির নাগর বিদ্যার সাগর মৌলভী সম্প্রীতি ।
যাহের আলি, তাহের আলি ঘুনিতি ।
বড়ো, ছোট এনাতুল্য, লক্ষীপুরের তরিবুল্য-
পাগলা কানাই বেড়বাড়িতি ।
এবার দেখা যাক, কবি তাঁর নিজের জন্ম সন-তারিখ সম্পর্কে কি বলেন-
“নয় সালেতে বা’ন তুলেছে পাগলা কানাই বেড়বাড়ি ।
গাছের সংগে খোঁজ নেয় তার রস জ্বালায়ে মরি”।
“নয় সালেতে বান তুলেছে পাগলা কানাই বেড়বাড়ি ।
ফাগুন মাসের ২৫ তারিখ আহা কি রূপ ছিরি।
ওর কেউ বা কুঁজো কেই বা দাঁ’তো তাও দেখি হাসে মরি ।
আমি করবো কি রে ভাই সকলরা করণ সব বিধাতারি
এখানে নয় সাল বলতে যে, ১২০৯ বাংলা সাল তাতে কোন সন্দেহ নেই এবং নয় চোখো বান’ বলতে নিজের আবির্ভাবের কথা বলা হয়েছে। “উজোলের মাজা কুঁজো, পাগলা কানাইর দুই দাঁত উঁচো” বলে যে প্রবাদ আছে, সে ইঙ্গতও তিনি দিয়েছেন।
অতএব আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, নিরক্ষর ও চারণ কবি পাগলা কানাই বাংলা ১২০৯ সালের ২৫শে ফাল্গুন রোজ সোমবার প্রত্যুশে বেড়বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন । এবারে এ সম্পর্কে কিছু আলোচনায় আসা যাক ।
১। লেখকের পিতামহ জনাব নছর উদ্দিন সাহেব ১২৮৪ সালে জন্ম গ্রহন করেন । এবং ১৩৭১ সালে তার মৃত্যু হয় । এনার ১৪/১৫ বছর বয়সে ১২৯৭ সালে ভীষণ এক বন্যা হয়। কবির ভাষায়,-
“এবারকার ভাদ্র মাসে বান এল সর্বদেশে,
ওরে গরু মলো ঘাস বেগরে, মাঠে তলায় পাকা ধান।
মানুষ মলো অন্ন বিনে, পোড়া বান আলো ক্যান” ।
(১২১ নম্বর পদ, মৎ সংগৃহিত।)
এ সম্পর্কে ভাব সঙ্গীতজ্ঞ পাণ্ডু শাহের পদে সমর্থন মেলে-
“জলের খেলা দেখে ঠেলা কম্প হলো মহাপ্রাণ ।
৯৭ সালের বন্যায় থাকলো না আর কুল মান” ।
এ সম্পর্কে ভাব সঙ্গীতজ্ঞ পাণ্ডু শাহের পদে সমর্থন মেলে-
(ভাব সঙ্গীত, খোন্দকার রফিউদ্দিন, ২য় খন্ড, ১৪৫ নম্বর পদ।)
“জৈষ্ঠ আর আশ্বিনে ঝড়ে, কত যে বৃক্ষ পড়ে তোমার দানে খাড়া হয় ।
যত ফল মরেছিল, সর্ব ফল মিলে তায়”।
এ ঘটনার উল্লেখ করে জনাব নছর উদ্দিন সাহেব বলেন, “এ সময় দেশে খুব অভাব দেখা দেয়। পাগলা কানাইয়ের বড় ছেলে জনাব গহর আলি অন্যান্য লোকের সাথে আমাদের বাড়ি ধান নিতে আসেন তখন তিনি বেঁচে ছিলেন তবে গান বড় একটা করতেন না। ধৌতের পর বেশিদিন বেঁচে ছিলেন না। আষাঢ় মাসে তাঁর মৃত্যু হয়। খামারাইলের হাফেজ সাহেব জানাজায় আসলেন না। পাগলা কানাইয়ের গান হলে আমাকে কেউ ধরে রাখতে পারতো না। লাঙ্গল গরু মাঠে ফেলে রেখেই ছুটতাম”।
এখানে একটি হাট ছিল। কলিকাতা গেজেটে ‘নগরবাথান হাট এর উল্লেখ আছে। ১২৯৭ সালের ঝড়-বৃষ্টি ও প্লাবনে বাজারটা ভেঙ্গে যায়। পুনরায় বাজারটা জমজমাট করে তোলার জন্য কর্তৃপক্ষ বাজারটাকে পুনঃজমজমাট করে তোলার জন্য সাপ্তাহিক বাজারের দিন গানের আয়োজন করতো। একেক দিন একেক জন বয়াতিদের আনা হত।
এ সময়ে চারণ কবি পাগলা কানাইয়ের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছিল। পান্নার দাওয়াত পেলেন বটে, কিন্তু অসুস্থতার জন্য যেতে পারলেন না । পাঠালেন, আড়ুয়াডাঙ্গা নিবাসী কবির অন্যতম প্রিয় শিষ্য সুলতান মোল্লাকে । লক্ষিপুরের তরিবুল্লাহ বয়াতি ছিলেন পান্নার প্রতিপক্ষ। দুঃখের বিষয় সুলতান হেরে গেলেন সে জলসাতে। এ সংবাদ কবির নিকট পৌঁছলে বাঘের মতো গর্জে উঠলেন । বললেন,
“কি বললি! হারিয়েছে তারে বয়তী ?
আমি কানাই বাঁচে থাকতি ।
নিয়ে আয় পালকী-
দেখবো তারে বয়াতির ভেলকী
এই বলে অসুস্থ কবি তখনই পাল্কী চড়ে নগরবাথান যাত্রা করলেন। পুনরায় দু’পক্ষের মধ্যে পাল্লা শুরু হল। কবি নিজেও গান করলেন। এবং শিষ্য বৃন্দ দিয়েও গান করালেন। শেষ পর্যন্ত তরীবুল্লাহ বয়াতি পরাজিত হয়ে বললেন, “পাগলা কানাই ওস্তাদ ব্যক্তি। তাঁর কাছে হেরে গেলেও মান যায় না” ।
এ সম্পর্কে উল্লেখ করে প্রত্যক্ষদর্শী বাদল বিশ্বাস আরও জানান, “আমার বয়স তখন ১৩/১৪ বছর। আশ্বিন মাসের শেষে কাদা-পানি কম হলে গান হয়েছিল। সুলতান হেরে গেলে পাগলা কানাই আসেন গান করতে। তখন তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। দু’ দিক থেকে ধরে রাখলেন দু’ জন । তিনি গাইলেন –
বুড়ো বয়সে পাগলা কানাই,
এ ধুঁয়ো বান্ধেছে ভাই,
ধূয়োর নাম স্বর্গ-পাতালে।
“ভাইরে ভাই ধুয়োর বিচার করে।
দানের পার এক শকশো পয়দা,
আল্লাহর পয়দা নাইকো যে ।
আসমান জমিন পবন পানি-
ত্রি-ভুবোন জুড়ে রাখেছে… ।
তরীবুল্লাহ বয়াতি আর উত্তর দিতে পারলেন না। এরপর তিনি আর বেশি দিন বেঁচে ছিলেন না । সম্ভবত এই হলো তাঁর শেষ জলসা ।
২। কুমড়া বাড়িয়ার জনাব ভাগাই জমাদার সাহেব(১৯৮৩ খৃঃ বেঁচে থাকলে বয়স হতো ১২১ বছর) ১২৯০ সালে বিয়ে করেন। তখন তার বয়স ছিল ১৯/২০ বছর। এ সময় নগরবাথান নীল কুঠির সাহেব ছিলেন স্বরূপদাস নামে নাপিত বংশীয় এক নব্য খৃষ্টান। তাঁর দেওয়ান (ম্যানেজার) ছিলেন বেড়াদিয়া গ্রামের বাবু রাম কেশব। তিনি চারণ কবি পাগলা কানাইয়ের সমসাময়িক এবং একজন বড় ভক্ত ছিলেন।
বেড়াদিয়া গ্রামে কবির মাতুল সম্পর্ক থাকায় তিনি তাঁকে মামা বলে সম্মোধন করতেন। ১২৯০ সালে তিনি এখানে এক ছুঁয়ো গানের আয়োজন করেন। কবির প্রতিপক্ষ ছিলেন ‘হরমনি ঠাকুরানী’ বলে এক মহিলা বয়াতি। সেকালে এসব গানের জগতে মহিলাদের বড় একটা দেখা যেত না। সভাবতই এসব অনুষ্ঠানে বেশি বেশি লোকের সমাগম হতো। প্রত্যক্ষদর্শী জমাদার সাহেব বলেন, “আমি সে জলসাতে নতুন কুটুম্ব সাথে উপস্থিত ছিলাম ।
তিন দিন গান হবার পর হরমনি পরাজিত হন” । কবির মৃত্যু সম্পর্কে তিনি লেখককে জানান,-“পাগলা কানাই’ ৯৭ সালের পর দেড়/দুই বছর বেঁচে ছিলেন। ২৮শে আষাঢ় মৃত্যু হয়। জুমার নামাজ পড়ে আমরা দেখতে যাই। খামারাইলের হাফেজ সাহেব জানাজা করতে আসলেন না। শেষে বিনা জানাজায় মাটি দেয়া হয়” ।
৩। তালিয়ান-নাটুপাড়া গ্রামের জনাব নখাতুল্লাহ মণ্ডল ১৯৯২ খৃঃ ১৩২ বছর বয়সে মারা যান। বৃটিশ রাজ কর্তৃক নলডাঙ্গা প্রথম সম্মানিত রাজা ‘প্রথম ভূষণ দেব রায় বাহাদুর-১৩ এর রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে ১৮৭০খৃঃ এক পাল্লা গানের আয়োজন করা হয়। এ জলসাতে মণ্ডল সাহেব উপস্থিত ছিলেন। ১২৯০ সালে এখানে এক পাল্লা গানের জলসাতে কবির প্রতিদ্বন্ধী ছিলেন শিষ্য ইদু বিশ্বাস।
তিনি ওস্তাদকে হারাবার জন্য খুব চেষ্টা করতে থাকেন এবং অতি উচ্চ স্তরের কঠিন প্রশ্ন করতে থাকেন । প্রচলিত একটা বিশ্বাস বয়াতি কবিদের মধ্যে প্রচলিত আছে যে এমন কতক গুলো মারফতি বিষয় আছে যা সাধারণ সভায় প্রকাশ করলে সে আর বাঁচে না ।
(এ কথার প্রত্যক্ষ প্রমাণ কৰি শিষ্য আড়ুয়াডাঙ্গা নিবাসী সুলতান মোল্যার জীবনে দেখা গেছে) । সে কারণ কবি পাশ কাটিয়ে উত্তর করতে থাকেন । কিন্তু ইদু বিশ্বাস বড়ই নাছোড় বান্দা । শেষে বুদ্ধি করে কবি পাগলা কানাই এই গানটা রচনা করে গাইলেন । গানটার একাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তুমি উজোলের করলে কোলে,
কানাইকে ফেললে জলে ।
মিয়া ভাইগো আমার-নেও কোলে তুলে” ।
রাজা প্রমথ ভূষণ দেবরায় গানের ভাবধারা বুঝে ফেললেন এবং ঘোষণা দিলেন যে, পাগলা কানাই গানের উত্তর ঠিকই জানে তবে মিয়া ভাই বলে সম্বোধন করার জন্য উত্তর না দিলেও পুরস্কার সেই পাবে। প্রত্যক্ষদর্শী নখাতুল্লাহ বলেন, “ঐ দু’টো গানের আসরেই আমি ছিলাম । ৯৭ সালের ধৌত বানের পর আষাঢ় মাসে তিনি মারা যান। খামারাইলের হাফেজ সাহেব জানাজা করেননি তাও শুনেছি ।
৪। কবি শিষ্য ও পালিদোহার এলেম শাহ্ ফকির, বারাসাত, পঃ বঙ্গ, ভারত, ১৯৭১ খৃঃ বয়স ছিলো ১১২ বছর । ইনি যশোর রাজপথে ভিক্ষা করে বেড়াতেন । এখন বেঁচে আছেন কিনা জানি না। আমি কৌতুহল বশতঃ তাকে ডেকে গরীব শাহ্ পীর সাহেবের মাজারে বসে আলাপে জানতে পারলাম যে, তিনি ছিলেন চারণ করি পাগলা কানাইয়ের শিষ্য ও পালিদোহার। কবির কথা বলতেই তার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
অনেক কথাই তার নিকট থেকে সংগ্রহ করা গেলো । (যথাস্থানে তার বিবরণ দেওয়া হবে)। ওস্তাদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধায় প্রতি কথায় তিনি কাঁদতে লাগলেন। শাহ্ সাহেব বললেন, “আবেগে কথা শেষ করতে পারলেন না। ওস্তাদের প্রতি এতো ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মান আর কোথাও দেখতে পাইনি। তিনি বলেন-“পীর মা আমাদের নিজ হাতে খেতে দিতেন। না খেয়ে আমরা কোনদিন আসতে পারিনি”।
কবির ওফাতের কথা বলতেই তিনি আবারও ডুকরে কেঁদে ওঠলেন। চোখ মুছতে মুছতে ধরা গলায় বললেন,“পীর সাহেব বেড়াবাড়িতে জন্ম নেন এবং ওখানইে ওফাৎ যান। তিনি ৯০ বছর বেঁচে ছিলেন। ২৮শে আষাঢ় শুক্রবার ওফাৎ যান।
প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শেষ শুক্রবার আমরা ওরশ করতাম। সুলতান ভাই চলে যাওয়ার পর ওরশ বন্ধ হয়ে যায় । এবার তিনি একটু জোরে কেঁদে ওঠলেন । বললেন, আমার কপাল খুব মন্দ, ওনার বিদায় কালে আমি দেশের বাড়িতে ছিলাম । আমার মনে হলো ওস্তাদকে কবরস্থ করেতে না পারার বেদনা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
৫। ঝিনাইদহের মোরারিদহ গ্রামে জমিদার সলিমুল্লাহ চৌধুরী বাড়ি নির্মাণ করেন ১২২৯-১২৩৬ সালে। তার স্ত্রীর ইচ্ছাতে প্রতিনিয়ত গানের জলসা বসতো, বাড়ি নির্মান শেষ হলে তিনি এক যাকজমক অনুষ্ঠান করেন।
উপস্থিত সকল লোকই সেবা গ্রহণ করেন। কবি পাগলা কানাই প্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে গান করছেন বলে যানা যায়। যদি ১২১৬ সালে কবির জন্ম হয় তবে তখন তার বয়স ছিল ১৩-১৯ বছর। মাত্র এ বালক বয়সে পাল্লায় গান করা সম্ভব কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়। কিন্তু ১২০৯ সালে জন্ম ধরা হলে বয়স হতো ২০-২৭ বছর। প্রতিভাধর ব্যক্তির পক্ষে এ বয়সে পাল্লা করা অসম্ভব ছিল না। সেখানে অনেক গানই করা হয়েছে। এর মধ্যে নিমের গানটি প্রণীধান যোগ্য –
আরো ও মিয়ার সোনার মুরদা চান্দের বাজার,
আমরা চার বয়াতি গাচ্ছি জারী, এই মিয়ার দরগায় ।
তায় পাগলা কানাই বলে, ও আল্লাহ বলরে-
আরে ও মিয়ার জয় জয় । (মৎ সংগৃহীত)
উপরোক্ত আলোচনার নিরিখে আমাদের সিদ্ধান্ত এই যে, নিরক্ষর মরমী চারণ কবি পাগলা কানাই ১২০৯ সালের ২৫শে ফাল্গুন, রোজ সোম বার, বেড়বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ৯০ বছর কর্ম জীবন সমাপ্ত করার পর ১২৯৯ সালের ২৮শে আষাঢ় (বৃহস্পতিবার দিন গত শুক্রবার ভোররাত্রে পরলোক গমণ করেন।
আমরা আর এটা মাত্র তথ্যের অবতারণা করে এ প্রসঙ্গ শেষ করবোঃ- চারণ কবি পাগলা কানাইয়ের মৃত্যুর সপ্তাহ পর ফরিদপুর জেলার পদ্মাপার থেকে দু জন লোক আসে ঘোড়ামারা গ্রামের ইদু বিশ্বাসকে নিতে। ইদু বিশ্বাস তখনও ওস্তাদের মাজার ছেড়ে যান নি।
লোক দুটো এসে জানালো যে, তাদের ওখানে পাগলা কানাইয়ের সাথে এক বিরাট পাল্লা গানের আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু কেউই তার সাথে গান করে পারছে না। তাই তিনি পাঠিয়ে দিলেন যে, যদি গান শোনার ইচ্ছা থাকে তবে আমার দেশ থেকে ইদু বিশ্বাস বলে আমার শিষ্যকে নিয়ে এসো । খুশীতে ইদু বিশ্বাসের কিছুই মনে এলো না। তিনি নেচে ওঠলেন ওস্তাদের সাথে পাল্লা করার কথায় ।
যাবার জন্য তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে ওস্তাদের নাম স্মরণ করতেই নিজের ভুল বুঝতে পারলেন । লোক দুটোকে বললেন, হ্যা ভাই যেতে পারি তবে আপনাদের কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। ওস্তাদের পর দেখাতে পারলে যেতে পারি। এই বলে তিনি নিম্নের পদটা গেয়ে শুনিয়ে দিলেন । লোক দুটো থ হয়ে রইলো । পদটা নিম্নরূপঃ-
আমার বলতে ও বিদরে প্রাণ, দয়াল বন্ধু হুব্বুহান।
কখন কি করে বিধি, না জানি তার সন্ধান ।
ওরে পাগলা কানাই ছিলো ভালো, করতো চোটে গান ।
যতো লোক প্রধান প্রধান, বলে পাগলা কানাইর আন ।
শোন পাগলার গান ।
এবার কার তলব হয়ে, সরকারী শমন পেয়ে,
ও সে গেছে নিজস্থান ।
১২৯৯ সালের ২৮শে আষাঢ়, ছিলো অশান্তে কাল ।
বৃহস্পতি গতো বিধি হরে নিচ্ছে কাল ।
ফিকির করে নেবে তোরে, আবার ফিরে চল।
দেখে এলাম পাগলের দল, কি হবে বল,
কানাইর সংগে পান্না হবে, ইদু বিশ্বাস তুই চল ।
ইদু বিশ্বাস বলে ও মন, তুমি কেমন কথা কও?
ও মন, কথা ফের না কও, চুপি চুপি ফিরে যাও।
বায়না বিনে যায়না, ইদু বিশ্বাস ভেবে কও ।
আমাদের নিতে চাও, সাইজীর পত্র দেখাও, ঠিক কথা কও ।
আমার হবে মজা, দেখবো ভালো- ধর্ম রাজার হাত চিঠিখান দাও ।
চারণ কবি পাগলা কানাই, লালন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একথা আমরা অস্বীকার করি না যে, গ্রাম্য লোক সাহিত্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা অগ্রগণ্য । লোক সাহিত্য সংগ্রহ ও সৃষ্টি এক কথা নয়। যাদের মুখে মুখে লোক সাহিত্য সৃষ্টি বা রচিত হয়েছে তাদের স্থান সংগ্রহকারীদের তুলনায় অনেক উচ্চে । বস্তুতঃ পক্ষে যে সব লোক-কবি লোক সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন বিচিত্রধর্মী সাহিত্য রচনা করেছেন, যে সাহত্যিগুলো প্রচার করে প্রচারকারীরা যশস্বী হয়েছেন-রবীন্দ্রনাথ তাদের প্রতিভূ ।
লালন শাহ্ সম্পর্কে বলতে গেলে যে কথাটা সর্ব প্রথমে বলতে হয় তা হলো, তিনি একজন উচ্চ দরের বাউল পন্থী সাধক। তাঁকে বাউল কুল শিরোমনী বলা হয়। অপর পক্ষে চারণ কবি পাগলা কানাই ছিলেন সাধক ও কবি দুই-ই । রবীন্দ্রনাথ প্রচার করে, লালন সাধনায় এবং পাগলা কানাই কবিত্বে ও সাধনা উভয়েই খ্যাত হয়েছেন ।
রবীন্দ্রনাথ আধুনিক কালের এবং লালন ও পাগলা কানাই রবীন্দ্র পূর্ব কালের উজ্জল নক্ষত্র। তিন জনই কবি প্রতিভা নিয়ে জন্ম লাভ করেছেন সত্য তবে লালনের উপর পাগলা কানাইয়ের প্রভাব যতো না পড়েছে, তার থেকে অধিক মাত্রায় পড়েছে লালনের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের উপর। শুধু তাই নয়, লালনের প্রভাবই তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করতে সাহায্য করেছে।
তাই, তিনি জার্মানিতে বাংলা সাহিত্যের উপর বক্তৃতা কালে বলেছিলেন, আমি পূর্ব বঙ্গের দুইজন জনপ্রিয় সুফির নিকট হইতে অনেক কিছু সংগ্রহ করিয়াছি । তাহাদের একজন লালন শাহ্ এবং অপরজন হাসন রাজা । এথেকে আমরা এক কথায়ই বলতে পারি যে, রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব সাহিত্যের তুলনায় প্রভাবিত সাহিত্যেই তাকে সম্মানিত করেছে বেশী ।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মূলতঃ কবি । বাউল মতবাদের প্রভাব তাঁর উপর এত বেশি পড়েছে যে, তাঁর কবিতার ভাব-গভীরতায় তাকে পাগল করে তুলেছে । আর লালনের সাধনাই ছিলো মুখ্য । এ সাধনার ক্ষেত্রে যতোটুকু প্রয়োজন তাই তিনি কবিত্বে প্রকাশ করেছেন । তিনি ছিলেন আধ্যাত্মবাদী বাউল মতবাদে বিশ্বাসী । তাই তার কবিতাগুলো বড়ই একমুখী হয়ে দেখা দিয়েছে। অপর পক্ষে পাগলা কানাই ছিলেন কবি ও সাধক দুই-ই। অর্থাৎ, কবিত্ব ও সাধনা সমভাবে তাঁর কাছে ধরা পড়েছে। শুধু তাই নয়, লোকসাহিত্য যতগুলো দিক নির্দেশ করে তাঁর সবই কানাই কাব্যে ধরা পড়েছে । তাই বলে আমরা একথা বলিনা যে, রবীন্দ্রনাথ ও লালন কাব্য ও আধ্যত্মিক ক্ষেত্রে একেবারেই পিছিয়ে ছিলেন ।
পাগলা কানাই ছিলেন চারণ কবি । তাই, সুরের দিক থেকে বলা যায়, কানাইয়ের বহুমুখী সুর ব্যঞ্জনা শ্রোতা মণ্ডলীকে সকলের থেকে বেশী আকৃষ্ট করেছে । “স দূর্গাদাশ লাহিড়ী মহাশয় কানাই সুর বলে এক নতুন ও অভিনব সুরের উল্লেখ করেছেন”। সে সুরে মোহিত হয়েছে সারা বাংলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ- মানুষের হৃদয় ।
এ সম্পর্কে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বলেন, “তোরা তো কানাইয়ের গান শুনিস নাই, তাঁর গান শুনলে মানুষ পাগলা হইয়া যায় ত ক্ষেত্রে তার গান গুলো শুধু সহজ, সরল ও মানুষের হৃদয়ের অভিব্যক্তিই ছিলো। না, তার কণ্ঠে ছিলো অপূর্ব ব্যঞ্জনাময় সুর-লহরী যা মানুষের মর্ম স্পর্শ করেছে।
তিনি জীবন ও জগতকে যে ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন তা লালন ও রবীন্দ্রনাথ থেকে সুদূর প্রসারী কম ছিলো না। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বেশিই ছিলো। নিরক্ষর হয়েও যে মানুষ অসাধারণ হতে পারে চারণ কবি পাগলা কানাই ছিলেন। তার একটা জলন্ত প্রমাণ ।
কবি পাগলা কানাইয়ের সমসাময়িক কবি লেখকদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগর, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, সাহিত্য সম্রাট মোশারফ হোসেন, কায়কোবাদ, হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, নবীন চন্দ্র সেন, লালন শাহ, ইদু বিশ্বাস ,পাঞ্জু শাহ, রামজী দাস, হারু ঠাকুর, ভোলা ময়রা, গৌবিন গোঁসাই, যাদু বিন্দু, কবীর চাঁদ, হরমনি ও চিন্তামনি ঠাকুরানী, শ্রী রূপ ক্ষেপা, বলাই চাঁদ, দুদ্দু শাহ, একরাম চাঁদ শাহ, নীল কণ্ঠ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ আরও কবি লেখকগণ ।
কারও না কারও প্রভাব এঁদের মধ্যে কম বেশী ধরা পড়েছে। যদিও এরা ছিলেন। এক একটা উজ্জল নক্ষত্র। আর, এমন যুগের এক কবি হয়েও পাগলা কানাই স্বীয় প্রতিভা ও স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছেন। এবং এখানেই পাগলা কানাইয়ের কাব্যের স্বার্থকতা । রবীন্দ্রনাথ যেখানে চার দেয়ালের মধ্যে সুদৃশ্য কুঠরীতে এবং লালন নিজ আখড়ায় শিষ্য-প্রশিষ্যের মধ্যে কবিতা ও গান রচনা করেছেন।
সেখানে পাগলা কানাই রচনা করেছেন চারণ কবি রূপে সারা বংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে। এখানেই এই তিন কবির রচনার পরিবেশগত ভাব ও মৌলিক পার্থক্য ধরা পড়েছে। কবি পাগলা কানাইয়ের প্রভাব লালনের উপর এবং লালনের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের উপর কম বেশী পড়েছে তা আমরা আগেই বলেছি ।
তাঁর কাব্যে বহুকালের ভাববাণী প্রকাশ পেয়েছে। এ লালন ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে ধরা পড়েনি তা নয় । শুধু পার্থক্য যে, রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতায় সাহিত্যের সকল শাখায় বিচরণ করেও স্বাতন্ত্র বজায় থাকেনি ।
এদিক থেকে, চারণ কবি পাগলা কানাই একজন স্বার্থক সাধক-কবি, সুরকার ও গায়ক । আধ্যাত্মিক সাধনার পাশে থেকে একজন স্বার্থক কবি সুরের মায়াজালে সাধারণ মানুষের হৃদয় কেড়ে নেবার ও শিল্প সৌন্দর্য মণ্ডিত করে তোলার ক্ষমতা এক মাত্র পাগলা কানাই ছাড়া বড় একটা চোখে পড়ে না । এটাই তার সমসাময়িক লোক সাহিত্যিকদের অভিমত।

কবিতা রচনা ও আধ্যাত্মিক সাধনা পাগলা কানাইয়ের নিকট ধরা পড়ে। তাই, তিনি পথে যেতে বিড় বিড় করে কি যেন বলেন, কা’র সাথে যেন কথা বলেন । হাত নেড়ে, মাথা নেড়ে ও অঙ্গ-ভঙ্গীর মাধ্যমে কি যে বলেন তা কেউ বুঝতে পারে না ।
সবাই ভাবে পাগল। কিন্তু, তিনি যে কতো বড় সাধনমার্গের উচ্চ স্ত রের সাধক ছিলেন তা আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনি। তাই অক্ষেপ করে তিনি বলেছেন, “সহস্রদল পদ গাঁথা, গরল খেতে বড় বাঁধা আমি খেয়ে জীর্ণ করি” । “আমি মরে দেখেছি, কয়েকদিন বেঁচে আছি, মরার বসন পরেছি”। “আবার আমি একলা দুকলা পথ দিয়ে যায়, হাত নাড়ি আর মাথা নাড়ি, ‘তোর’ সঙ্গে কই কথা । তফাতের লোক দেখে বলে, পাগল নাড়ে মাথা” ।
এখানে গরল খেয়ে জীর্ণ করা, মরা ও মরার বসন পরা এবং ‘তোর সঙ্গে কই কথা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এরূপ উচ্চ মার্গে ভ্রমণ এক মাত্র পূর্ণ আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব । রবীন্দ্রনাথ, “ছাড়িতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবন” বলে আধ্যাত্মবাদের ধারা প্রত্নেই রয়ে গেছেন । লালন শাহ সুফি মতবাদে ফনাফির শেখ নিয়েই ব্যাস্ত রইলেন । এবং সেখানে বাকাবিল্লায় বিচরণ করে পাগলা কানাই জীবনকে স্বার্থক করেছেন । এ থেকেই আমরা বুঝতে পারি, লালন শাহ ও তার ভাবশিষ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং চারণ কবি পাগলা কানাইয়ের কবিত্ব শক্তি ও আধ্যাত্মিক শক্তির মৌলিক দিক ।
