ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী : বাংলার সুফি ফকিরদের মধ্যে লালনের স্থান সর্বোচ্চ, কিন্তু লালনের মৃত্যুর পরে যিনি সারা বাংলার ফকির মহলে লালনেরই মত উচ্চ স্থানলাভ করিয়াছিলেন, তিনি ফকির পাণ্ডু শাহ। লালনের মৃত্যুর অব্যবহিত পর হইতেই প্রায় পঁচিশ বৎসর যাবৎ পাঞ্জু শাহ অনেকটা লালনের শূন্যস্থান পূরণ করিয়া রাখিয়াছিলেন। লালনের মত তাঁহার রচিত গান বাংলার সর্বত্রই পাওয়া যায় এবং ফকির মহলে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে গীত হয়।

  ১২৫৮ সালের শ্রাবণ মাসে ফকির পাঞ্জু শাহ যশোহর জেলার শৈলকূপা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইনার পিতার খাদেমালী খোন্দকার সাহেবের ইনি প্রথম পুত্র। ইনার পিতা একজন সঙ্গতিপন্ন লোক ছিলেন। কু-চক্রীর ষড়যন্ত্রে উত্যক্ত হইয়া বিষয় বিভব তুচ্ছবোধে ইনি স্বীয় স্ত্রী ও বালক পুত্রসহ যশোহর জিলার হরিণাকুণ্ডু থানার অধীন হরিশপুর গ্রামের বিশিষ্ট সম্ভ্রান্ত, অবস্থাপন্ন বিশ্বাস পরিবারের মাননীয় ফকির আহম্মদ বিশ্বাস দিগর সাহায্যে ও আন্তরিক সহানুভূতি পাইয়া উক্ত হরিশপুর গ্রামে দরিদ্রভাবে বসবাস করেন। তাঁহার আত্মসম্মান জ্ঞান ও দ্রতায় তিনি গ্রামস্থ সকলের শ্রদ্ধাভাজন হন। ফকির পাঞ্জু শাহের পিতা একজন গোঁড়া মুসলমান ছিলেন। শাস্ত্রীয় আচার অনুষ্ঠানে (Formalities) নিষ্ঠাবান হইয়া ইনি বাংলা ভাষা শিক্ষারই বিরোধী হন এবং স্বীয় পুত্রকে আরবি, ফারসি ও উর্দু শিক্ষাদানে প্রবৃত্ত হন। ১৫/১৬ বৎসর বয়সে ফকির পাঞ্জু শাহ গোঁড়া পিতার ভয়ে, বিশ্বাস পরিবারের মহরালী বিশ্বাসের নিকট স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া গোপনে বাংলা ভাষা শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। তৎকালে হরিশপুর গ্রাম বিশেষ সমৃদ্ধ ছিল। সকল শ্রেণীর হিন্দু-মুসলমান পরস্পর মিলিতভাবে বসবাস করিতেন। সুফি ফকিরের মধ্যে জহরদ্দীন শাহ, পিজিরদ্দীন শাহ, ফকির লালন শিষ্য দুধ মল্লিক শাহ, (দুদ্দু শাহ) প্রমুখ সুফিতত্ত্ববিদ সাধু ও হিন্দুদের মধ্যে মদন দাস গোস্বামী, যদুনাথ সরকার, হারাণ চন্দ্র কর্মকার, প্রমুখ সমবেতভাবে বৈষ্ণব সাহিত্য বেদান্ত, ইসলামের সু-উচ্চ তাছাওয়াফের গভীর তত্ত্ব আলোচনা করিতেন। প্রায়ই সুফি ফকির ও বৈষ্ণবগণ সুফিমতবাদ ও বৈষ্ণব তত্ত্ব গান ও সিদ্ধান্ত আলোচনায় তৃপ্তিলাভ করিতেন।

এই সমস্ত বিষয় ফকির পাণ্ডু শাহের পিতা পছন্দ করিতেন না। ঐ সংশ্রবে যাতায়াত বা ওঠা-বসা নিষেধ সত্ত্বেও পাণ্ডু শাহ গোপনে যাতায়াত করিতেন। কখনও ইহা প্রকাশ পাইলে ইহার লাঞ্ছনার সীমা থাকিত না। এইভাবে পিতা বর্তমান থাকা পর্যন্ত তাঁহার মনোকষ্টের ভয়ে ইনি সঙ্গোপনে গভীর আগ্রহ সহকারে সুযোগমতে সাধুসঙ্গে সময় কাটাইতেন। ২৪/২৫ বৎসর বয়সে ইঁহার বিবাহ। ১২৮৫ সালের ২০ ভাদ্র ইহার পিতা পরলোক গমন করেন। পিতার মৃত্যুর কিছুদিন পর ইনি খেরকা খেলাফত ধারণ করেন। এই সময় হইতেই তাঁহার ধর্মজীবন আরম্ভ হয়। হরিশপুর গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে হেরাজতুল্যা খোন্দকার নামে সুফিতত্ত্ববিদ সাধুর নিকট ইনি দীক্ষিত হন। ইনি গুরুনিষ্ঠা ও গুরুর সেবাযত্নে একান্ত আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রায় ৩৩/৩৪ বৎসর হইতেই ধর্মানুরাগ জ্ঞান গরিমায় মুগ্ধ হইয়া ২/৪ জন করিয়া ইহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে থাকে। এই সময় ইনি ইস্কি ছাদেকী গওহর নামে একখানি কেতাব রচনা করেন এবং সুফি মতবাদ সম্বন্ধীয় গান রচনা করিতে আরম্ভ করেন। ক্রমেই দেশ-দেশান্তরে শিষ্য সংখ্যা বর্ধিত হইতে থাকে। নিজ জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, নদীয়া, রাজশাহী, পাবনা, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা, সুদূর আসাম বিভাগেও অনেকে ইঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আজিও বাংলার বহু স্থানে ইহার রচিত পদাবলী আগ্রহ সহকারে গীত হয়। জীবনে অক্ষয় কীর্তি রাখিয়া ১৩২১ সালে ২৮ শ্রাবণ, ৬৩ বৎসর বয়সে ইনি পরলোক গমন করেন। সং হতভাগ্য মধ্যম পুত্র খোন্দকার রফিউদ্দিন সাং-হরিশপুর, পো: সাধুগঞ্জ, জেলা: যশোহর।

Table of Contents

 

ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী

১। দীনের রাছুল এসে, আরব শহরে দীনের বাতি জ্বেলেছে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দীনের রাছুল এসে, আরব শহরে দীনের বাতি জ্বেলেছে।। দীনের বাতি রাছুলের রূপ উজালা করেছে।। মহম্মদ নাম নূরেতে হয়, নবুয়তে নবী নাম কর, রাহুল উল্লা ফানা ফিল্লাহ, আল্লাতে মিশেছে।। মহম্মদ হন সৃষ্টিকর্তা, নবী নামে ধর্ম দত্তা, শরিয়তের ভেদ ওতে রেখে শরা বুঝায়েছে।। জাহেরা ভেদ জাহেরাতে, আশেকের ভেদ পুসিদাতে, মহর নবুয়ত আশকদারকে দেখায়ে দিয়াছে।। রাজুল রূপ যার মনে আছে, মনের আঁধার মুচে গেছে, অধীন পাণ্ডু ভাব না জেনে ভ্রমেতে ভুলেছে।।

২। জীব তরা’তে তরিকের কিস্তি নবী ঘাটে এসেছে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

জীব তরা’তে তরিকের কিস্তি নবী ঘাটে এসেছে।। গোনাহ গারে নিবেন পারে তরিক যে ধরেছে।। নবী দিচ্ছে তরিক জাহের, পুসিদাতে ভেদ হয় খোদা, পুসিদা তরিক রাছুল ছিনাতে দিয়াছে।। বেহেস্ত পাবে তরিক জাহেরা, পুসিদাতে পারে খোদা, আশকদারে খোদার জন্য বেহাল হয়েছে।। বেহেস্তের আশা দোজখের ভয়, আশকদারের মনে না হয়, আল্লাপানে অহনিশি চাহিয়া রয়েছে।। মজবুত তরিক এই হয়, তরিক কিস্তি আশেকে পায়, অধীন পাণ্ডু ভাব না জেনে ভ্রমেতে ভুলেছে।।

৩। নবী চিনা হল ভার।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

নবী চিনা হল ভার।। নবী না চিনিলে ভবে কেমনে হইবে পার।। জেন্দা থেকে না পাইলে মলেত পাবানা আর।। খবর শুনি আরবেতে নবী হলেন এস্তেকাল, হায়াতেল মোরছালিন বলে কেনে লিখেন পরওয়ার।। দেখে শুনে অনুমানে দেলে ধাঁধা হয় মনে বলে নবী ম’লে দুনিয়া রইত না আর।। আছে সত্য নবী বর্ত চিনে কর রূপ নেহার, নিরুচাঁদের চরণ ভুলে পাণ্ডু হল ছারেখার।।

৪। নবী চিনে কর ধ্যান।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

নবী চিনে কর ধ্যান।। আহম্মদে আহাদ মিলে আহাদ মানে ছব্বাহান।। আতিউল্লাহ আতিয়ররাছুল দলিলে আছে প্রমাণ।। আল্লার নূরে নবীর জন্ম নবীর নূরে ছারে জাহান, নূরে জানে আদম তনে বসত করে বর্তমান।। আওল আখের জাহের বাতেন চারিরূপে বিরাজমান, বাতেনে গোপনে থেকে জাহেরে দেন তরিক দান।। তরিক ধন সাধন কর আখেরে পাবা আসান, বর্তমানে নাহি জেনে পাণ্ডু হয় হতজ্ঞান।।

৫। দীনের কথা মনে যার হয়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দীনের কথা মনে যার হয়।। আগে দেল কেতাবের খবর লয়।। মুরশিদ ধরে দেশের খবর জেনে শুনে ফানা হয়।। শরিয়ত তরিকত, হকিকত মারেফত, মুরশিদের হয়ে গত সুধাইয়া লয়, লাহুত নাহুত মলকুত জবরুত, আল্লা কোথায় আছে মউজুদ, কোন মোকামে মালেক আল্লা, কোন মোকামে বারাম দেয়।। চার কালেমা চারি কলে, তৈয়ব কালমা মূল নিহারে, এমনি অমূল্য ধন, তাই খোঁজে সদায়, নূরী জহুরী জোব্বরী, ছত্তরী পিয়ালা চারি, কবুল করে হুশিয়ারী, রাখেনা সে কুলের ভয়।। পাঞ্জাতন গুণমনি, জাহের বাতেনে শুনি, আলী নবী মা জননী, এযাম দোন ভাই, পাঞ্জাতনের মর্ম জেনে, পানজাগানা পড়ে মনে, সামনে মুরশিদ বরজখ ধ্যানে কদমেতে ছের ঝোকায়।। জবরুতের পরদা খুলে, দিবেন মুরশিদ দয়া করে, নূর ছেতারা উদয় হয়ে রূপে ঝলক দেয়, সদা থাকে রূপ নিহারে, দীনের কর্ম তারাই করে, পাঞ্জু বলে মোর কপালে, জানি কি করিবেন দয়াময়।।

৬। মালেক আল্লার আরশ কালেবেতে রয়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মালেক আল্লার আরশ কালেবেতে রয়।। খুঁজে দেখলিনা মন হায়রে হায়।। আছে কালেবেতে কালুবালা, কালাম উল্লায় জানা যায়।। কুলুবেল মুমেনিন বলে, কোরানে সাঁই খবর দিলে, দেখনা দুই নয়ন খুলে, ছাব্বিশ ছেপারায়, ছফিনাতে দেখে শুনে, ছিনার এলম লেহ জেনে ছিনার এলম ছফিনাতে;’ জানবে কেন দীন কানায়।। নবী আদম বারিতালা এক দমে হয় লীলা খেলা, দলিলে বলেছেন খোলা, রাছুল দয়াময়, নাফাকত ফিহে বলে, দেখনা হাদিছ দলিলে, দীন কানার কথায় ঘুরে মলে, পেড়পীড়ে মদিনায়।। আঠার হাজার আল্লার আলম, আঠার মোকামে মিলন, আরশ কোরশ লওহ কলম, অজুদে সবায়, এই কালোব মালেক আল্লা, চেঁচালে পড়িবে গলা, পাণ্ডু তমনি আলাঝালা, আছমানে চেয়ে খোদা চায়।।

৭। মাবুদ আল্লার খবর না জানি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মাবুদ আল্লার খবর না জানি।। আছে নির্জনে সাঁই নিরঞ্জন মণি।। অতি নিশুম ঘরে বিরাজ করে সাঁই গুণমণি, তথা নাহি দিবা রজনী।। যখন নাহি ছিল আছমান আর জমিন, অন্ধকারে হেমান্ত বাও বইছিল আপনি, সেই বাতাসে, গায়বী আওয়াজ হলো তখনি, তা জানেন জগৎ জননী।। সেই আওয়াজ ভরে ডিম্ব হয়। শুনি, ডিম্ব ভেঙ্গে আছমান জমিন গঠলেন রব্বানি, শুনি সাততালা আছমানের পরে রয়েছেন তিনি, আছে অচিন মানুষ অচিনি। সেই ডিম্বর খেলা আদমে খেলে, চেতন মুরশিদ চিনে ধরলে সে ভেদ জানাবে, পাণ্ডু বলে না ডুবিলে রতন কি মিলে, ডুবিলে হবি ধনি।

৮। শুধু কথায় রতন কি মিলে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

শুধু কথায় রতন কি মিলে।। চেতন মানুষেরই সঙ্গ না নিলে।। আল্লা নবী আদম ছবি করেছে নিলে, দেখ কে আছে মন কি কলে।। সিংহাসনে বসে একেলা, ছাদেকী এস্ক পয়দা করলেন মালেক আল্লা, সেই এস্ক জোরে নূরে পয়দা করলেন রাছুলে, এসে দোস্তী করলেন দিলে।। সেই মহব্বতে আদম গঠিলে, হাওয়া আদম আল্লা নবীর ভেদ কেবা বলে, ভেদ জানিলে অধর মিলে এ ত্রিভুবনে, জানা যাবে মুরশিদ ভজিলে।। বেহেস্ত যাওয়ার আশা করিলে, দোজখ বেহেস্তের খোন্দকার পাঞ্জু শাহের পদাবলী ॥ ১৪৭ মালেক যে জন তারে না চেনে, অধীন আঞ্জু বলে ভেদ না জেনে কলমা পড়িলে, শেষে পড়বিরে গোলেমালে।।

৯। আল্লার বান্দা কিসে হয়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আল্লার বান্দা কিসে হয়।। নবীর উম্মত হলে জানা যায়।। আল্লার বান্দা নবীর উন্নত এজগতে সবাই কয়।। আঠার হাজার আলমে আছে নব্বই হাজার কালাম তার, ছিনা সফিনা দুই ভাগে রয় ষাইট হাজার এই দুনিয়ায়, তিরিশ হাজার কালামে আহাদ; তার খবর আর কেবা পায়।। জেন্দগী ভর বন্দেগী করিতে মোরে সবায় কয়, গোলামী করিলে বান্দা হাদিসে তা জানা যায়, কিসে হয় আল্লার গোলামী খোলা নাই ভেদ ছফিনায়।। ভেদ জানিয়া নূর সাধিলে কালাম ছিনা হয় আদায়, সাধন বর্ত নূরে নীরে বর্জোখে ভজন তার, পাণ্ডু বলে আহাদ কালামে দয়া করবেন দয়াময়।।

১০। ফানা ফিল্লাহ্ হওরে মন।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ফানা ফিল্লাহ্ হওরে মন।। দেখ বান্দা হওয়া ভেদ কেমন।। ফানা হয়ে জাতে মিশে আল্লারে কর সাধনা।। আদম জাতে ফানা হতে বলেছেন সাঁই নিরঞ্জন, আল্লার জাতে মিশলে তা’তে গোলামী না হয় একজন, জানতে হয় কোন জাতে ফানা কবুল করবেন মওলা ধন।। আদম রূপে ফানা হলে নাস্তি হল এ জনম, কোন জাতে কোন রূপে বাকা হয়ে ভজি সাঁইর চরণ, ছাদরাতল মস্তাহায় খোদা গোলামের হয় কোন আসন।। দাস্যপানা সাঁই রব্বানা আমায় করিবেন কবুল, যদি মিমেতে মশগুল করেন, আপে মহম্মদ রাছুল, হিরুচাঁদ কয় অধীন পাঞ্জ দিন থাকিতে লও স্মরণ।।

১১। শুধু কি আল্লা বলে ডাকলে তারে পাবি ওরে মন পাগেলা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

শুধু কি আল্লা বলে ডাকলে তারে পাবি ওরে মন পাগেলা।। যে ভাবে আল্লাতালা বিষম লীলা ত্রিজগতে করছে খেলা।। কতজন জপে মালা তুলসীতলা, হাতে ঝোলে মালার ঝোলা, আরো কত হরি বলি মারে তালি নেচে গেয়ে হয় মাতেলা।। কতজন জয় উদাসী তীর্থ বাসি, মক্কাতে দিয়াছে মেলা, কেউবা মসজিদে বসে তাঁর উদ্দেশ্যে সদায় করছে আল্লা আল্লা।। স্বরূপে মানুষ মিশে স্বরূপ দেশে বোবায় কালায় নিত্য লীলা, স্বরূপের ভাব না জেনে চমর কিনে হচ্ছে কত গাজীর চেলা।। নিত্য সেবায় নিত্য লীলা, চরণ মালা, ধরা দিবে অধর কালা, পাঞ্জ তাই করে হেলা, ঘটল জ্বালা, কি হবে নিকাশের বেলা।।

১২। ভজ নিরঞ্জন, লায়লাহা ইল্লাল্লা পড় আমার মন।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ভজ নিরঞ্জন, লায়লাহা ইল্লাল্লা পড় আমার মন।। বড় অমূল্য রতন, এ নাম নিদানের ধন।। যখন নাহি ছিল আছমান জমিন রে, ছিলেন একা মওলা ধন, বড় সাধ করিয়ে গঠলেন আল্লা থাকি আদম তন।। কে বুঝিতে পারে আল্লারে তোমারই মক্কর, বড় দোস্ত ছিল তোমার আজাজীল খাসতন, তাবেদার ছিল তার রে ফেরেস্তা যত জন, সেই আজাজীল দোষী হলো আদমের কারণ।। খাক হতে থাকি আদমরে গঠলেন আদম তন, কোন চিজেতে হাওয়া বিবি করিলেন সৃজন।। মক্কর মাঝারুল্লা আল্লারে তারে খাওয়ালে গন্দম, গন্দম খেয়ে আশক জ্বালায় জ্বলে দুইজন।। আরফার মাঠে দোহায় রে করিলে মিলন, নূর নীরেতে করলে আল্লা সৃষ্টিরই পশুন, কে বুঝিতে পারে আল্লারে কুদরতের বিবরণ, পাণ্ডু বলে নূর সাধিলে পাইতাম চরণ।।

১৩। চেয়ে দেখ ভবের হাটে মনরে তোর ব্যপার হল কি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দেশ ছেড়ে বিদেশে আলি, দেশে যাবার উপায় কি।। হাকিম দিয়াছিল ধন, মন তোর লাভেরই কারণ, লাভে মূলে সব হারালি, হিসাবে ফাঁকি ঝুঁকি। যে ধন লয়ে ভবে এলে রে, তা চেন আমার মন, কিসে লভ্য হবে তার জান সে কারণ, মায়া দালালে ধরে, ফতুর করল যে তোরে, কলুর বলদের মত, ঠুসি দিল তোর চোখী।। আশার একটি বাসা বেঁধে রে, ভবে করছি গোজরান, কোন দিন আশার বাসা ভেঙ্গে নিবেন মালেক ছবহান, ভাই বন্ধু যত জন, তোর কে হবে আপন, কেহ যে দরদের বেটা, মাটি দিবে তোর মুখি।। হাসরের মাঠে আল্লারে আপনি পরওয়ার, নেকী বদির হিসাব আল্লা করিবেন সবার, অধীন পাণ্ডু কেঁদে কয়, জানি কি হবে উপায়, পাষাণে ঠুকিবে মাথা হিসাবের কাগজ দেখি।।

১৪। দম টান মন দমের খবর জেনে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দম টান মন দমের খবর জেনে।। দম থাকিতে দমবাজীতে ভুলে রইলি কেনে।। তিন দমের তিনটি ধারা, জানলে হয় জেন্দা মরা, আদমে অধর ধরা, দেখ জেনে শুনে, দিদম শনি দম গোপ্ত দমে নাম কর গোপনে।। দিদমে দেখ তারে, যে আনে ভবের পরে, পাঞ্জাতন সঙ্গে করে বসে সিংহাসনে, নূর ছেতারা ঝলক দিচ্ছে, দেখরে নয়নে।। শনিদয়ে সাধন কথা, শোন অমূল্য যথা, পাবা সাঁই জগৎ কর্তা গুরুর ধিরানে, পাঞ্জুর হল মুখের কথা, ভজন সাধনে।।

১৫। দম জেনে লও দমের মালা গলে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দম জেনে লও দমের মালা গলে।। আল্লা মহম্মদ আদমে একদমে তিন মিলে।। আদমে সাঁইজির খেলা, জপ দম দমের মালা, দূর কর তছবি মালা, মন মালায় ধন মিলে, মনের মানুষ দমে জপে বসাও হৃদকমলে।। আদমে দমের শুমার এক লাখ আর চৌত্রিশ হাজার, রাত দিনে জান খবর, চব্বিশ হাজার মূলে, ভুলে আল্লা এক দম ফেলা, মানা হয় দলিলে।। যে জপে দমের মালা, জানে সে কাবাতুল্যা, বয়তুল্লার ঘর আল্লাতালা দিবেন তার দেলে, তাই জানিতে অধীন পাপ্পু ফিরতেছে বদ হালে।।

১৬। আল্লার নামে মন ভোলে না দুনিয়াদারী ফাঁদে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আল্লার নামে মন ভোলে না দুনিয়াদারী ফাঁদে।। আজরাইল আসিয়া কোন দিন নিবে ধরে বেঁধে।। যে দিনে গোর আজাব হবে, দুনিয়ার মায়া কোথায় রবে, মনকীর নকীর, দেখে সেদিন মরবি কেঁদে কেঁদে।। রোজ হাসরে সূর্যের তাপে, তাপে সেতে মারা যাবে, সেই দিন মনে জানতে পাবে, কপালের নিষে।। আল্লাতালা কাজী হবে, নেকী বদির হিসাব নিবে, দুই ফেরেস্তা সাক্ষী দিবে, বসে বান্দার কাঁধে।। পোলঘুরাতে হিরার ধারে, বড় সঙ্কট হবে পারে, পাণ্ডু বলে পারের সম্বল, আছে হিরুচাদে।।

১৭। ভবে এসে রলাম বসে হারা হয়ে দিশে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ভবে এসে রলাম বসে হারা হয়ে দিশে।। পাছের কথা ভুলে রলাম দুনিয়াদারী বেশে।। কার সাথে এই ভবে এলম, আগে ছিলাম কোন দেশে, যার সাথে এসেছি ভবে তারে পাব কিসে।। সাথের সাথী হারা হয়ে, ভুলে রলাম রঙ্গ রসে, আলাভোলায় পথ ভোলালো, ভূতে মারবে ঠেশে।। সঙ্গের মানুষ অঙ্গে ধুয়ে, ঘুরে মলাম দেশে দেশে, পাণ্ডু বলে দিন ফুরাল, চরণ পাব কিসে।।

১৮। আল্লার নাম কর দম বদমে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আল্লার নাম কর দম বদমে।। হল নফি এজবাত নিজ নামে।। নাম করিলে উদ্ধার হব, আল্লা পাব কোন কামে।। শুনি বার বুরুজে, কোন বুরুজে কিসে থাকে কি নাম ধরে, বরজোখ ধ্যানে রূপ দেখা যায়, মঞ্জিল আর মোকামে।। মলকুত-মোকামে, ছিয়া ছফেদ লাল জরদে চার রং ধরে, অতুলনা মুরশিদের রূপ মাখা আছে আদমে।। রং দেখি ধ্যানে; অধর চাঁদকে।। ধরা যাবে কোন সাধনে, সাধন সন্ধান বল, বলি সাধুর কদমে।। সিদ্ধি হবে সাধনে, খোদা প্রাপ্তি কিসে হবে, ভজন বিনে, পাণ্ডু বলে ভজন আল্লার কলমে আর আলমে।।

১৯। কি সাধনে আল্লাতালা পাই।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

কি সাধনে আল্লাতালা পাই।। সাধন ভজন ভুলে দিন গেল ভাই।। সন্ন্যাসী হইয়ে কেউ, সর্বত্যাগী হল কেউ, সাঁই গো, শুনি সেও ভ্রমে ভুলে ফিরিছে সদাই।। ঘড় ছেড়ে বনে যায়; রিপু তার সঙ্গে রয় সাঁই গো; বনে গেলে আল্লা পাব, এখানে কি নাই।। আমি কোথায় সে কোথায়, কোথা গেলে তারে পাই সাঁই গো, ভেবে দেখি দেহ ছাড়া নাহি কোন ঠাঁই।। নূরে আছে নিরাকার, জেনে সাধ্য কর তার, মন রে পাণ্ডু বলে দিন গেল, আর হবে নাই।।

২০। আল্লা খুশী হবে কোন কামে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আল্লা খুশী হবে কোন কামে।। সাধু গুরু দয়া করে বল এ গোলামে।। রোজা ও নামাজ করি, ভাল হয় আপনারই সাঁই গো, নেক কামে বেহেস্তে যে দিবেন আদমে।। খয়রাত যাহা করি, সেহ নেকী আপনারই হায় গো, আত্মসুখ জন্য আল্লা ডাকি দমে দয়ে।। সাধনে অটল হই, খোদা সাথে মিশে যাই সাঁই গো, গোলামী কি তাতে হয়; খোদার কদমে।। যেই হয় গুরু কাজি, আল্লা তাহে হয় রাজি, সাঁই গো, পাণ্ডু বলে মন তুমি মজ গুরু প্রেমে।।

২১। ছাদেকী আশকে হয় সতী।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ছাদেকী আশকে হয় সতী।। রূপ দেখে পাগল হয় কুলের কুলবতী।। কুলেতে সে দিয়া হাই, এলাহির জাতে যায় সাঁই গো, জীবে তারে নিন্দা কয়, থাকে সে খুশীতি।। সে লয়েছে স্কন্ধে ঝুলি, পেয়েছে কলঙ্কের ডালি, সাঁই গো, লোকে তারে গালি দেয়, পারেনা ভুলিতি।। আশকে উদাস হয়, গুরুপদে মন দেয় সাঁই গো, পীরিতি পাগলের প্রায়, এই তার গতি।। ভজন সাধন ভাই, মুরশিদের কদম তার সাঁই গো, শমনেতে পারে নাই, মৃত্যুকালে ছুতি।। পাণ্ডু বলে ওরে মন, ভজ আল্লা নিরঞ্জন, সাঁই গো, সাঁই, হিরুচাদের চরণ হবে সাথের সাথী।।

২২। আদমেতে আল্লা আছে মিলে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আদমেতে আল্লা আছে মিলে।। আলা কুল্লে সাইন মেহিত কোরানেতে বলে।। মোকাম মঞ্জিল ভাই, দেহেতে দিয়াছে সাঁই হায় গো, দেহ ছাড়া আল্লা জানে শয়তানী ভোলে।। যে ভাবেতে আল্লা সাঁই, আদমেতে আছে ভাই, হায় গো, না জেনে কিনার নাই, বন্দেগী করিলে।। দলিল পড়িয়া ভাই, মৌলভী হইল তায় হায় গো, মনেতে ভেবেছে এই, বেহেস্তে যাবে চলে।। ইঞ্জিল পড়িয়া কেউ, সর্দ আদমি হল সেও, হায় গো, মোর দিন ভাল বলে, ডঙ্কা মেরে চলে।। ভাগবৎ পড়ে কেউ, পণ্ডিত হল সেও হায় গো, বলে সেও স্বর্গে যাবে।। হিন্দু লোকের দলে।। সেই স্বর্গপুরী ভাই, হাতে ধরা কারো নাই হায় গো, নাচানাচি করে তাই, পোলো গোলমালে।। দেহ চিনে সাঁই ধর, পার পাবা পারাবার, হায় গো, গুরুর চরণ ধর, পাণ্ডু কেঁদে বলে।।

২৩। খোদার আশকী যেই হবে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

খোদার আশকী যেই হবে।। ষোল আনা এক তোলা ওজন হইবে।। ভবের ওজন ভাই, রতি হবে ঠিক তাই হায় গো, বে ওজন মাল সেই খোদা নাহি লবে।। ওজনের মূল এই, এক তোলা জান ভাই, হায় গো, কিসে হয় তোলা ঠিক, জানিয়া লইবে।। এক তোলা বাটখারা, দেখ সে কেমন ধারা হায় গো, সের মণ কাঁচা পাকা তোলা ঠিক রবে।। যথায় যে ওজন হয় তোলা কভু নড়ে নাই, হায় গো, শরিয়ত মারেফাত তাহাতে জানিবে।। ভবে যত কারবার, করিবারে পরওয়ার, হায় গো, খাস ভাণ্ডারের তোলা ভেঙ্গে দেয় সবে।। অচিন সে তোলা ভাই, ইমান আমান তাই হায় গো, তাহার ওজন সাঁই কবুল করিবে।। হীন পাণ্ডু কেঁদে কয়, সত্য করে বলি ভাই হায় গো, ভজন সাধন ভাই তোলাতে হইবে।।

২৪। সহজে কি আল্লাতালা পাবে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

সহজে কি আল্লাতালা পাবে।। মায়া কেটে দয়ার দেল আগে বানাইবে।। আল্লাতালা দয়াময়, দয়া ভিন্ন পাবা নাই হায় গো, দয়াতে যে ধর্ম আছে, সকলে জানিবে।। মাতা পিতা দেখ ভাই, মেরে ধরে বিদ্যা দেয় হায় গো, মায়া করে নাহি মারে বিদ্যা কোথা পাবে।। আল্লাতালা সেই মতে, এমান বুঝিয়া নিতে; হায় গো, কুলমান মেরে তায়, বেহাল বানাবে।। জানে মালে কষ্ট দিয়ে, এমান বুঝিবে ভেয়ে, হায় গো, থাকে যদি সই হয়ে তাকে ধরা দিবে।। পা বলে ওহে সাঁই, দয়া দেল আগে চাই হায় গো, যাহা কর হবে তাই, আমার নছিবে।।

২৫। আল্লা পাবে সত্য প্রেমি হলে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আল্লা পাবে সত্য প্রেমি হলে।। সূর্যের ধিয়ানে যমন রয়েছে কমলে।। জলেতে কমল রয়, স্বভাব তাহার হয় সাঁই গো, বিকশিত সূর্যোদয়ে মুদিত অস্ত গেলে।। যে দিকে সুরুজ চলে কমল সেই দিকে হেলে সাঁই গো, ফেরেনা সে কোন কালে ঝড়ি তুফান হরে।। তেমনই আশকদার পতিকে করেছে সার সাঁই গো, যদি হয় ছারেখায়, তবু নাহি টরে।। মনরে কমল হও, গুরুপদে মন দাও সাঁই গো, ভব কূলে কালি দাও, ভুলোনা কারো ভোলে।। হীন পাণ্ডু আলাঝালা, না জানে পীরিতী জ্বালা সাঁই গো, মেলে কি মালেক আল্লা মূঢ়ার কপালে।।

২৬। যে ভাবে ফিকির করে সাঁইজি মোরে বানিয়েছে মানব লীলে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

যে ভাবে ফিকির করে সাঁইজি মোরে বানিয়েছে মানব লীলে।। এই লীলা কী চমৎকার, ভেদ বোঝা ভার, নিজরূপ মিশাইলে।। নিরাকারে আকার মিলে, সাঁই নিরলে; দ্বিদলেতে বারাম দিলে, আপন লীলাতে ভুলে, সাঁই পাতালে পদ্ম ফুলে মধু খেলে।। লীলা ছলে সাঁই মিশিলে, ধোকা দিলে জীবেরে ধরিল কালে, ধোকার টাটি পরিপাটি, কুলের লাটি, কেন জীবের হাতে দিলে।। জীবের মনে কুটী নাটি ধুলা মাটি, কত জনার খাওয়াইলে, কারে করে উদাসী তীর্থবাসী, বনে বনে ঘুরাইলে।। গোসাঁই হিরুচাঁদে বলে, ভাব না জেনে, দিন হারালে গোলেমালে, যাঁর ভাবে চরণ মিলে, তারে ভুলে পাণ্ডু মিছে ঘুরে মনে।।

২৭। নূরের খবর জানি নাই।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

নূরের খবর জানি নাই।। আল্লার নূরে নবীর জন্ম শুনতে পাই।। নবীর নূরে ছারে জাহান, নূর ছাড়া আর কিছুই নাই।। নূর কোন পাত্তরে খণ্ড করলেন দয়াময়, খণ্ড করে আঠার হাজার আল্লার আলম গঠলেন তায়, ইনছান হারান বৃক্ষ আদি, নূরে পয়দা করলেন সাঁই।। আদমের দেহে নবীর নূর সব বর্ত রয়, আবার কোন নূরেতে কোহ্ তুরেতে, মুছা নবী দিদার পায়, নূর তাজেল্লার তাপে জ্বলে, কোত্তুর পাহাড় পুড়ে যায়।। নূর চিনিলে আল্লা নবী পাওয়া যায়, এই দেহের মাঝে সেই নূর আছে, মুরশিদ ধরে জানতে হয়, হিরু চাঁদ কয় অধীন পাণ্ডু, নূর বিনে তোর উপায় নাই।।

২৮। এই মানুষে নবীর নূরে ঝলক দেয়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

এই মানুষে নবীর নূরে ঝলক দেয়।। দেহ খুঁজলে পাওয়া যায়। ছিয়া ছফেদ লাল জরদে, নূরের আসন ঘিরে রয়।। মোকাম লাহুত-নাছুত-মলকুত জবরুত চারি হয়, চার মোকামে মঞ্জিল দ্বারে, গুপ্ত বেশে কিরণ দেয়, লা মোকামে নূরের আসন, হাহুতে নহবত বাজায়।। নূরে হস্তপদ নাসা কর্ণ কিছুই নাই, অঙ্গহীন সে আপন জোরে বেগ ধরে ত্রিবেণী যায়, সেই না ঘাটে পদ্ম ফুলে ভ্রমর হয়ে মধু খায়।। বড় যত্ন করে ঐ ভ্রমরকে ভজতে হয়, কিসে যত্ন হবে তার, এও ঠেকিলাম বিষম দায়, অধীন পাণ্ডু বলে নূরের যত্ন কেবল জানেন ফাতেমায়।।

২৯। হায় আল্লার কোদরতে। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

হায় আল্লার কোদরতে। সব পয়দা করলেন জগতে।। কোদরত কোদরত সবাই বলে, পারলাম না তাই জানিতে।। কোদরত কয় কারে, কিসে থাকে আল্লার কোদরত, কি রং ধরে, চরণ ধরি বিনয় করি, সে পার ভাই বলিতে।। যখন সাঁই নিরাকারে, ভেসেছিলেন বারিতালা ডিম্বভরে, আছমান জমিন কোদরতে হয়, ডিম্ব হল কিসেতে।। নিরঞ্জন নীরে, হজরত নবী পয়দা হলেন, আল্লার নূরে, নূর নীরেতে মালেক আছে, কোদরত আছে কার সাথে।। সাঁই হিরুচাঁদ বলে, আল্লার কোদরত না চিনে তুই ভজলি কারে, পাণ্ডু বলে ভ্রমে ভুলে বেড়ালি পথে পথে।।

৩০। মুরশিদ ভজিলে, আল্লা পাওয়া যায় ভবে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মুরশিদ ভজিলে, আল্লা পাওয়া যায় ভবে।। সত্য সত্য সত্যগুনি, কোরানে বলে।। অলিয়েম মোরশেদা বলে, কোরানে সাঁই খবর দিলে, মালেক মোক্তার, ধর মুরশিদ, ভজ মুরশিদ, আছে ঐ কলে।। আছমান সপ্ত তালার পরে, আছে সত্তর পরদা ঘিরে, সিংহাসন পর, এমন অমূল্য মেলে, বান্দার কপালে।। খালাকা আদামা বলে, আলো-ছুরাতিহি লেখে, আদম রূপে সাঁই, পাঞ্জু বলে ঝলক দিচ্ছে, এসে দ্বিদলে।।

৩১। আদমেরে কি দোষে খোদায়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আদমেরে কি দোষে খোদায়।। বেহেস্ত হইতে তা’রে এ ভবে ফেলায়।। গন্দম যে মানা হল কে গন্দম খাওয়াইল সাঁই গো, কারে দোষী করি বল, কি করি উপায়।। পয়দা করিলে তারে, ভালবাস আদমেরে সাঁই গো; তোমার যে ভালবাসা, মন্দ কেনে তায়।। তোমার যে বে হুকুমে, কেহ নাহি কোন কামে সাঁই গো, জারা বালি নাহি নড়ে, শুনেছি তাহাই।। দীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, কি লিখেছে এ কপালে সাঁই গো, ভালবাসা কিসে হব ভাবি তাই।।

৩২। ফকির হয়েছি আল্লার রাগেতে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ফকির হয়েছি আল্লার রাগেতে।। সাধুগুরু চরণ ধূলি দাওগো আমার মাথাতে।। কত রাশি রাশি পাপের কর্ম করে ছিলাম এই হাতে।। ছবরকে বলিলাম মাতা, এ কিনকে, মাতা, আল্লার নাম মোর হৃদয় গাথা, মুরশিদ বন্ধু যাই সাথে।। ধনির ধন ফুরায়ে গেলি, পথের ফকির হয় তার গালি, পাপের ভারা দিলাম ফেলি, চালাও গুরু সুপথে।। লয়েছি এমানের ঝুলি, আর কি কলঙ্কে ভুলি, এসেছি এ সাধুকুলে, চলিব হাসতে খেলতে।। সাধু গুরু দয়া কর, পতিত পাবন নামটি ধর, পাণ্ডু বলে দাও কিনারে, হয় না যেন ফিরিতে।।

৩৩। ডোর কৌপীন দাওগো মুরশিদ আমারে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ডোর কৌপীন দাওগো মুরশিদ আমারে।। কাঙ্গাল হব মেঙ্গে খাব, আল্লাজীর দ্বারে।। সুখের শয্যা ত্যাজ্য করে এসেছি সাধুর দ্বারে।। পূর্ণ হল ভবের খেলা, ভেবে দেখি গেল বেলা, ঘিরে এল শমন জ্বালা, থাকি মরার হাল পরে।। স্কন্ধে লয়ে আছলা দোলা, ভিক্ষার ছলে বলব আল্লা, তাতে যদি বারি তালা, অধমের দয়া করে।। কোথায় ছিলাম ভবে এলাম, কুল বলে মুই ভুলে রলাম, ভোজের বাজী করে গেলাম, কোন গুণে পাব তারে।। কি করিবে ভবের কূলে, সঙ্গে নাহি যাবে মলে, অধীন পাণ্ডু বলে চরণ ভিক্ষা, দাও সাঁই মোরে।।

৩৪। ঠিক রেখ মন নবীর তরিক সই ষোল আনা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ঠিক রেখ মন নবীর তরিক সই ষোল আনা।। দর্জালের আমলে তরিক ঠিক রবে না।। (হায়) দর্জালের আমল হবে, বলেছে মুরব্বি সবে, হবে তা আখেরি জামানায়, আখেরি জামানার কিছু হচ্ছে নমুনা।। (হায়) দরবেশের চেলা যত, বিচার করে আত্ম মত, সাধু গুরুর বাক্য মানেনা, নিজ বুদ্ধি বড় জেনে দেয় উপাসনা।। (হায়) হাদিছ পড়ে আলেম হল, এলমের জোর সে করিল, তম করে মুরশিদ ভজে না, মোরশেদ বিনে নবীর তরিক, ঠিক রবে না।। (হায়) নবীর তরিক ভুলে গেল, হিংসা নিন্দা বৃদ্ধি হলো, খোদার বান্দা ভেবে দেখ না, পাণ্ডু বলে দিনের বাতি আঁধার কোরো না।।

৩৫। এ জামানায় নবীর তরিক ঠিক রাখা দায়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

এ জামানায় নবীর তরিক ঠিক রাখা দায়।। ধোকাবাজী ছন্দি কথায় মন ভুলে যায়।। নবীজীর আইন মত, রাছুলোত্মার অনুগত, হয়ে থাক মমিন সবায়, পড়োনা পড়োনা কেহ কাহারও ধোকায়।। মিথ্যাবাদীর নেকী যত হয়ে যাবে বরবাদ, দলিলেতে লেখা আছে তাই, ভেবে দেখি সত্যবাদী ভবিষ্যতে হয়।। সন্ন্যাসী উদাসী যত, আলেম ফাজেল মোল্লা কত, ছল কথা সকলেত কয়, ভেবে মল উম্মি লোকে কি করি প্রত্যয়।। দিন গেল দুনিয়ার লোভে, নিকাশের দিন কিবা হবে, অধীন পাণ্ডু ভেবে ইহা কয়, তরিকে ঠিক রাখ মুরশিদ হয়ে দেখ না।।

৩৬। শ্রীচরণ পাব বলে ভব কূলে ডাকে দীনহীন কাঙ্গালে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

শ্রীচরণ পাব বলে ভব কূলে ডাকে দীনহীন কাঙ্গালে।। পড়ে এই ঘোর সাগরে, কেউ নাই মোর, ঘিরে নিলো মায়াজালে।। সৃষ্টি করে আপ্তরসে, কোন বা দোষে, কালের বশে ফেলাইলে, কার ভাবে এসে, বেহাল বেশে দয়াল নাম প্রকাশিলে।। পতিত পাষণ্ড যারা, গেল তারা, মার খেয়ে তার চরণ দিলে, আমি হলাম এতই পাপী, দুঃখী তাপী, আমার ভাগ্যে লুকাইলে।। কল্পতরু নামটি ধর, বাম নয় কারো শুনে এলাম সাধু কূলে, দয়াল নামের মহিমা যাবে জানা, এই অধীনে চরণ দিলে।। গোসাঁই হিরুচাঁদের চরণ, হয় না স্মরণ, ভজনহীন তাই পাণ্ডু বলে, আমায় না চরণ দিলে, একই কালে, মানব জনম যায় বিফলে।।

৩৭। গুরুপদে নিষ্ঠারতি হয়না মতি, আমর গতি হবে কিসে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরুপদে নিষ্ঠারতি হয়না মতি, আমর গতি হবে কিসে।। মন আমার মূঢ়মতি, সাধন ভক্তি, হলো না মোর মনের দোষে।। মন আমার দিবারাতি, গুরু প্রতি থাকত যদি চরণ আশে, তবে চরণ দাসি হতাম ব্রজে যেতাম, থাকতাম ঐ চরণে মিশে।। পেতাম যদি সাধু বৈদ্য, মনের বেয়াদ্য, সেরে দিত সেই মানুষে, লেগে চরণের জ্যোতি, জ্ঞানের মতি, সদায় হয়ে উঠতো ভেসে।। দীনহীন পাঙ্গুর উক্তি, চরণ রতি, পান করিতাম ঘরে বসে, বাঁচতাম শমনের হাতে, অস্তিমেতে সদয় হতেন গুরু এসে।।

৩৮। গুরু দয়া কর মোরে গো বেলা ডুবে এল।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু দয়া কর মোরে গো বেলা ডুবে এল।। চরণ পাবার আশে, রলাম বসে সময় রয়ে গেল।। অমূল্য ধন লয়ে হাতে, ভবে এসেছিলাম ব্যাপার বলে, ছয়জনা বোম্বেটে জুটে, পথ ভুলায়ে সেধন লুটে নিলো। বেলা গেল সন্ধ্যা হল, যম রাজার ডঙ্কা বাজাইল, মহাকালে ঘিরে এল, সঙ্গের সাথী কেহই নারে হল।। কি হবে অন্তিমকালে, রয়েছি বিনা সম্বলে, পাণ্ডু বলে গুরু ভুলে, সাধের জনম বিফলেতে গেল।।

৩৯। আমারে ফেলনা গো মুরশিদ দয়াল হয়ে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমারে ফেলনা গো মুরশিদ দয়াল হয়ে।। চাতকের মত, আমি তোমার চরণ পানে চেয়ে।। অধম তারণ নাম শুনেছি, তাইতে কুল ছেড়ে বেহাল হয়েছি, ভব মাঝে পতিত হয়ে, ফিরতেছি কলঙ্কের ডালি বয়ে।। তোমার রূপে নয়ন দিয়ে, যাই যদি নরকী হয়ে, দয়াল বলে কেউ ডাকবে না ওগো মুরশিদ আমার হাল দেখিয়ে।। শুনে তোমার নামের ধ্বনি, ডাকতেছি এই রাত্রি দিন, পাণ্ডু বলে গুণমণি, দয়া কর শ্রীচরণ দিয়ে।।

৪০। দয়াল দরদী, কাঙ্গাল এল তোমার দ্বারে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দয়াল দরদী, কাঙ্গাল এল তোমার দ্বারে।। অক্ষয় ভাণ্ডার তোমার কেউ যাবে না ফিরে।। সর্বধনের দাতা তুমি ত্রিমহীমণ্ডলে, বিনা মাঙ্গায় কত ধন শুরু দিয়াছিলে মোরে, আর কোন ধন চাই না গুরু, চরণ দাও আমারে।। কুলের বাহির হলাম আমি, চরণ পাব বলে, কত মহা পাপীর দিলে চরণ তাই এসেছি শুনে, দাঁড়ালাম দরজায় এসে স্কন্ধে ঝুলি করে।। দাও কি না দাও রাঙ্গা চরণ, বেলা গেল চলে, দাতার চেয়ে বখিল ভাল তুড়ুক জবাব দিলে, পাণ্ডু বলে জবাব পেলে, যাই আমি চুপমেরে।।

৪১। দয়াল ধনি, আমি ডাকি ঐ নাম শুনি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দয়াল দরদী, কাঙ্গাল এল তোমার দ্বারে।। হেলায় চরণ দিতে পার, দিবা না সাঁই কেনে।। যা কর তাই করতে পার, এ তিন ভুবনে, ভক্ত রক্ষা করলে যেতে স্ফটিক স্তম্ভনে, তোমার স্মরণে প্রহ্লাদ মলোনা বিষ পানে।। তাই শুনে হয়েছি পাগল, পাপ পুণ্য জানিনে, সুধা বলে গরল খেলাম, তোমার ধিয়ানে, আমারে দিবানা চরণ কিসের কারণে।। প্রাণ সঁপেছি মান সঁপেছি, চরণ পাব বলে, পাণ্ডু বলে দাওনা চরণ ভেবেছ কি মনে, ধর্মেতে সবে না তোমার, বলছে দীনহীন।।

৪২। আমারে দাও চরণ তরি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমারে দাও চরণ তরি।। তোমার নামের জোরে পাষাণ গলে অপারের কাণ্ডারী।। ভক্ত অধীন নামটি শুনেছি, ভক্তের পিছে ফিরতেছ হরি, ভক্তিহীন হয়েছি আমি, স্মরণ নিলাম তোমারই।। নির্ধনের ধন অন্ধলার নড়ি, দুর্বলের বল হও গুণমণি, পাপী তাপী সব তোমারই আমায় ফেলনা হরি।। অহল্যা এক পাষাণী ছিল, চরণ ধুলায় সেও মানব হলো, পাণ্ডু কাঁদে ঘোর তুফানে, পারের উপায় কি করি।।

৪৩। বড় চিন্তা ঘুণ লেগেছে আমার অন্তরে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

বড় চিন্তা ঘুণ লেগেছে আমার অন্তরে।। মুরশিদ কোন গুণে পাব তোরে।। আমার দুই নয়ন ঝোরে, দুঃখ বলব আর কারে, কে মোর ব্যথার ব্যথীত—আমার কেবা আদরে, আমি প্রেম সাগরে ভাসাই তরি রে, আমার ডুবলো ভারা কিনারে।। আমার মন পাগল পারা, হয়না নিহারা, বনে বনে কেঁদে ফিরি, আমি পাইনা অধরা, যমন কলমী লতা জলে ভাসেরে, তমনি ফিরতেছি দ্বারে দ্বারে।। দুঃখ কই যারে তারে, এই ভব সংসারে, তোর বিনে ভরসা নাই, গুরু চরণ দাও মোরে, অধীন পাণ্ডু বলে মুরশিদ বিনে রে, কেঁদে ফিরতেছি দ্বারে দ্বারে।।

৪৪। ক্ষম হে অপরাধ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ক্ষম হে অপরাধ।।  দাসি করে অনুরোধ।। তুমি দীনবন্ধু করুণাসিন্ধু, আমারে দিওনা বাদ।। গগন চন্দ্র উদয় করো, তিমীর পাপী তাপী সবাকার, জ্যোতি লাগে তার, কোটি চন্দ্র যিনি কিরণ, নামটি শুনি দয়াল চাঁদ।। সৃষ্টিকর্তা তোমায় দেখি, কেন কর দুঃখী তাপী, ভক্তের কর দীপ্ত আঁখি, পাপীর অন্ধকার, করো কারো দীপ্ত কারো অন্ধ, তুমি আবার কেমন চাঁদ।। তুমি বাঞ্ছা কল্পতরু, পতিত পাবন জগৎ গুরু, পাণ্ডু বল করে না কারো, যা কর এবার, তোমার নামের জোরে পাষাণ গলে আমার গলায় মায়া ফাঁদ।।

৪৫। যা কর হে এবার।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

যা কর হে এবার।। গুরু দিলাম তোমায় ভার।। ভবে মাতা পিতা জ্ঞাতী বন্ধু; সঙ্গের সাথী কেউ নাই আর।। মুচির ছেলে রামদাস ছিল, গুরু ভজে সাধু হলো, কেঠোয় গঙ্গা সে দেখল, জগতে প্রচার, শুনি ত্রাসে ঘন্টা স্বর্গে বাজে, এতই দয়া করলে তার।। জোলার ছেলে কবীর ছিল, গুরু সেবা সে করিল, ছত্রিশ জাত তুড়ানী খেলো, জগন্নাথে তার, ভবে জানা গেল তীর্থ ধর্ম, গুরুর চরণ হলো সার।। গুরু সেবা যে করিল, শমন জ্বালা দূরে গেল, জগতে নাম প্রকাশিল, দাস হলো তোমার, পাণ্ডু কেঁদে বলে গুরু, ফাঁকি দিওনা আমার।।

৪৬। ও দয়াল চাঁদ আমারে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ও দয়াল চাঁদ আমারে।। তোমার ঐ চরণে দাসি কর মোরে।। তোমার আশার আশে রলাম বসে হে, দয় কর ভজন হীনেরে।। এ অধীনে না তরালে হে, দয়াল বলি কোন গুণে, দয়াল নামের গৌরব যাবে, কে ডাকবে তোমারে, পাপী তাপী উদ্ধারিলে হে, শুনেছি সাধ বাজারে।। দীন বন্ধু করুণা সিন্ধু হে, পতিতের কাণ্ডারী, জগাই মাধাই উদ্ধারিলে, মার খেয়ে তাহারই, তাই শুনিয়ে তোমায় ডাকি হে, দয়ার ফেলনা কাঙ্গালেরে।। দয়া যদি না করিবে হে, ত্রিমহি মণ্ডলে, তোমা বিনে কে আছে মোর, বলিব কাহারে, অধীন পাণ্ডু বলে যা কর হে সাঁই, আমি রয়েছি আশা করে।।

৪৭। দয়া কর গো সাঁই।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দয়া কর গো সাঁই।। এই ভবে আমার কেহ নাই।। বলি চরণে তোমায়।। পিতৃধন যতনে লয়ে এসেছিলাম সাধ করিয়ে, এ ভবে জুয়োচোরে লুটে নিলো তাই।। ঘিরে নিলো জালে, ত্রিবেণী ধরিল কালে, সে কালে চোর আশি ঘুরালো আমায়।। মণিহারা ফণী হয়ে, মলাম ভূতের বোঝা বয়ে, মনরে সাধের জনম বিফলেতে যায়।। অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, পতিত পাবন নাম ধরিলে, জানিব অস্তিম কালে, যদি চরণ পাই।।

৪৮। আমায় কিসে শুরু করবেন পার।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমায় কিসে শুরু করবেন পার।। পারের ঘাট না চিনে, ভাব না জেনে, সাগর বলে উলুবনে দেই সাঁতার।। ঘাটে জাহাজ পুরে আসে রতন কাঞ্চন, ঐ জাহাজে আছে খোদ মহাজন, বিলাচ্ছে সেজন, মহারত্ন ধন, না চিনে সে ধন হবেনা কিনার।। ঐ ঘাটের কূলে বসে আছে যেবা জন, লাভ করিছে সদায় অমূল্য রতন, ধরে শ্রীচরণ, পারে যাবি মন, ঘুচে যাবে ভবের ঘোরাফেরা তার।। ঐ ঘাটে ঘোড়াফেরা করি সর্বক্ষণ, না চিনি সে ঘাট একি বিবরণ, জাহাজের ধন জলে ফেলে মন, পাণ্ডুর হলো আদা পেঁয়াজ বেচা সার।।

৪৯। ভজনহীন বলে গুরু আমার হালের কাটা ছাড়িয়াছে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ভজনহীন বলে গুরু আমার হালের কাটা ছাড়িয়াছে।। জ্বরাতরি ভরাগাঙ্গে মনরায় ভাসায়েছে।। এ ভবসাগরে তরি ঘুরলো পাকে ঘুরতেছে।। হয় জনা ছিল দাড়ি, সদায় করিছে আড়ি, উঠে এল বিষয় ঝরি, চৌষট্টি ঢেউ বাঁধিয়াছে।। দশখানে উঠছে পানি, সেচে পার না পাই আমি, ডুবে এল সাধের তরি, পালের কানি এড়িয়াছে।। অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, একপালে কূল না মেলে, দেবংশে ধন নৌকায় ছিল, তাইতে দশা ঘটিয়াছে।।

৫০। গুরু কোন রূপে কর দয়া ভুবনে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু কোন রূপে কর দয়া ভুবনে।। অনন্ত অপার লীলা তোমার মহিমা আর কে কানে।। তুমি রাধা তুমি কৃষ্ণ, মন্ত্রদাতা তুমি ইষ্ট, মোর কানে মন্ত্র জানতে সঁপে দিলে সাধু বৈষ্ণব গোসাঁইর চরণে।। নবদ্বীপে গৌরাঙ্গ চাঁদ, শ্রীক্ষেত্রে হও জগন্নাথ, তাই শুনি, সাধু বাক্য ইহাই হল, দয়া হবেনা স্বরূপ বিনে।। বৃন্দাবন আর গয়া, কাশী, বালাকুণ্ড, বারাণসী, মক্কা মদিনা, তীর্থে যদি গোউর পেত, ভজন সাধন করে জীবন কোনে।। সাধু গুরুর চরণ পদ্মে, সর্ব সর্বতীর্থ আছে বর্ত, তা জানিনে, পাণ্ডু বলে অবোধ মন তোর মতি সরল হবে কোন দিনে।।

৫১। না ভজে সাধের জনম বিফলে যায়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

না ভজে সাধের জনম বিফলে যায়।। গুরু আমার সত্য দয়াময়।। দয়া করে দীনবন্ধু, গুরু রূপে এসে, কিবা যবন কিবা হিন্দু চক্ষুদানী দেয়।। যখন ভবে এলে, বলেছিলে গুরুর চরণ সাধন মনের সাধে, জননী জঠরে জন্যে, নিল মহামায় ঘিরে, ভুলে গেলাম পূর্ব কথা, পেটের জ্বালায়।। গুরুর বলে তোরে, সাধু হেল্লায় বনের কাষ্ঠ চন্দন হতে পারে, কুমতি কুস্বভাবে, হলো মাৎসর্য উদয়, সাধু গুরু পদে আমার, মতি নারে হয়।। জনম গেলাম হেরে, শমন ভুবন যেতে হবে, সেদিন এল ঘুরে, এ ভবের বন্ধু যারা, পর হয়ে যাবে তারা, পাণ্ডু কেঁদে বলে সে দিন কি হবে উপায়।।

৫২। অযোগ্য বলে গুরু ফেলনা আমায়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

অযোগ্য বলে গুরু ফেলনা আমায়।। আমি চরণ দাসের যোগ্য নয়।। যোগ্য লোকের দরা শুরু করে জগতে সবায়, তোমাবিনে অধম জনে কেহ না সুধার।। দয়াল সাধু মুখে শুনি, পাষাণ দলন পতিত পাবন তোমার নামের ধ্বনি, তাই শুনিয়ে স্মরণ নিলাম, যদি দয়া হয়, এ জগতে আমা বলতে আর ত কেহ নাই।। গুরু শুনি তোমার রায় জগাই মাধাই মেরেছিল, কাঁদা ফেলে গায়, বুকে বহে রুধির ধারা, তবু হয়ে দয়াময়, হরি নাম দিয়ে তারে, কোলে দিলে নিতাই।। শুনি অহল্যা এক নারী, মুণি পত্নী স্বামীর বাক্যে, পাষাণ হলেন তিনি, চরণ ধুলা দিয়ে তারে, মানব করলে তায়, অধীন পাণ্ডু চেয়ে আছে, ঐ ধুলার আশায়।।

৫৩। গুরু গো কোন গুণে আর তোমায় পাব।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু গো কোন গুণে আর তোমায় পাব।। যে দিন একা পথে পারে যেতে, ভবলোক ছেড়ে।। ভুলে মহা মায়ার ভোলে, মন গেলেনা সাধুর দলে, ভাবনা মন একই কালে, কিসে কাল কাটাব।। মন ভবের হাটে জুয়া খেলে, গুরু বস্তু ধন হারালে, হায়রে মন কি করিলে, কারবা দোষ আর দিব।। ওমন কি করিতে কিবা হলো, নিকাশের দিন ঘুরে এল, অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, কার পানে চাহিব।।

৫৪। আমি কি হলাম তোমায় ভিন।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমি কি হলাম তোমায় ভিন।। কত পাষণ্ড পামর গুরু তারে দিলে শুভদিন।। এ ভব সাগরে গুরু ঘুরে মল দীনহীন।। বানায়ে সাধের ভরি, বোঝাই দিয়ে নীর ও ক্ষীর, হেন তরি সঁপে দিলে, কুমতি এক মাঝির টিন।। তোমার তরি তুমি মাঝি, হলে বাঁচে দীনহীন, কেন রিপু ইন্দ্র মায়ার হাতে দিয়ে খুলে চিরদিন।। যা করাও তাই করি গুরু, এ তরির তুমি স্বাধীন, স্বাধীন হয়ে সাধ্য পথে আমায় করলে পরাধীন।। ভব নদীর মাঝে পড়ে, পালাম না ত কূলের চিন, দয়ার নাম প্রকাশে গুরু, অধীন পাণ্ডুর দাও গো দিন।।

৫৫। পাপী বলে আমায় ফেলনা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

পাপী বলে আমায় ফেলনা।। তোমার ধর্মে সবেনা।। ধর্ম বলতে তুমি ধর্ম কর্ম ফলতো গেলনা।। তোমার ধর্মের দয়াল স্বভাব, আমার নাইতো পাপের অভাব, এ পাপীরে উদ্ধারিতে দয়াল স্বভার ছেড়না।। বন্ধু বান্ধব যত ছিল, আমা বলতে কেউ না হোলো, তো বিনে এ পাপীর বন্ধু আর কে আছে বলনা। পতিত পাবন নামের ধন্য, শুনে পাপী করে দৈন্য, পাণ্ডু হলো সাধন শূন্য, তাইতে গণ্য হলোনা।।

৫৬। তুমি বাঞ্ছা কল্প তরু বাঞ্ছা পূর্ণ করোনা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

তুমি বাঞ্ছা কল্প তরু বাঞ্ছা পূর্ণ করোনা।। বাঞ্ছা করি চরণ পাব, কর্ম ফলতো রবেনা।। বড় বাঞ্ছা মনে করি, ডাকি তোমায় বলে হরি, পাপ তাপ হর হরি, আশাতে নিরাশ করোনা।। শুনে বাঞ্ছা করি হরি, মার খেয়ে দাও চরণ তরি, জগাই মাধাই দু’ভায়েরই, আমায় কি চোখে দেখনা।। অহল্যা পাষাণী ছিল, চরণ ধুলায় মানব হলো, তারা কি তোর আত্ম ছিল পাণ্ডু কি তোর কেউ হলোনা।।

৫৭। দিন আমার গিয়াছে, দিনমণি লুকাইয়াছে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দিন আমার গিয়াছে, দিনমণি লুকাইয়াছে।। বন্ধুগুরু কোথা রয়েছে।। মন আমার হয় উদাসী, কার সনে পোহাব নিশি মনের বাসনা মনে বসে রয়েছে, জানি কার বাসরে, বন্ধু পালিয়েছে।। মন একা ভবে এল, গুরু এসে দোসর হলো, পাষণ্ড মন আমার দোসর ছেড়েছে, তাইতে আশা বৃক্ষ ছেদন হয়েছে।। ঘোর নিশি চোখে ছানি, আমি হলাম একাকিনী, কিসে পোহাই রজনী কম্প হয়েছে, অধীন পাণ্ডু গুরুর দোহাই দিতেছে।

৫৮। গুরু তুমি ফেলনা অধমে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু তুমি ফেলনা অধমে।। বাঞ্ছা আছে গোলাম হব তোমার কদমে।। অযোগ্য হইয়ে মুই, কদমেতে ছায়া চাই সাঁই গো, বাঞ্ছা হয় তব রূপ ভাবি দমে দয়ে।। তোমা পানে যেবা চায়, রিপু তার বাদি হয়, সাঁই গো, রিপু শান্ত করি আমি বল কোন কামে।। দয়া কর দয়াময়, ভেবে দেখি বেলা নাই সাঁই গো, কোন ঘড়ি এসে মোরে, ধরে নিবে যমে।। চালাও সিদা রাহে সাঁই, তোমায় যেন তুলি নাই সাঁই গো, পাণ্ডু বলে এমান যে হয় আল্লার নামে।।

৫৯। আমার কি এত দয়া হবে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমার কি এত দয়া হবে।। জগতের স্বামী এই কপালে মিলিবে।। জনম না পাকে যায়, পাক দেহ হলো নাই সাঁই গো, ভক্তিহীন জীবের দয়া কিসে বা হইবে।। জীবের জীবন ধন, আহারে সে নিরঞ্জন, সাঁই গো, এমন অধম জনে কেন দেখা দিবে।। ভজন নাহিক, কোন গুণে গুণমণি, সাঁই গো, এমন যে অভাগিনী, দাসি বানাইবে।। গেল জনম বিফলে, ঘিরে নিলো মায়াজালে সাঁই গো, পাণ্ডু বলে অন্তিমকালে, বাম না হইবে।।

৬০। আমার কপালে এই ছিল। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমার কপালে এই ছিল। গোনাগার হয়ে জনম বিফলেতে গেল।। সময় যে মন্দ হলে, দোস্ত বন্ধু যায় ফেলে সাঁই গো, নিদানের বন্ধু গুরু দয়া না করিল।। কৃয়া হতে ইউছুফের, খালাস করিলে তারে সাঁই গো, এই অধমের দয়া তোর নাহি হল।। কত কত পাপী লোকে, দয়া যে করিলে তাকে সাঁই গো, আমার কি পাপ আত্মা মাফ না হইল।। বড় সাধ মনে করে, ধরেছিনু মুরশিদেরে, সাঁই গোঁ, তাহার কদম মোর কপালে না হলো।। পাণ্ডু বলে ওহে বারি, আমিত অবলা নারী, সাঁই গো, দাও গো চরণ তরি দিন বয়ে গেল।।  

৬১। চরণ ভিক্ষা দাও সাঁই মোরে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

চরণ ভিক্ষা দাও সাঁই মোরে।। ফেলনা ফেলনা আল্লা এই অধমেরে।। মাতা পিতা বন্ধু ভাই, ভেবে দেখি কেহ নাই সাঁই গো, পাপী বলে দয়া আল্লা কর কাঙ্গালেরে।। এই ভবে আসা কালে, আসিয়াছি খুশী হালে, সাঁই গো, লাভে মূলে ফুরাইল, সঙ্গে যাবে কে রে।। নেকী বদি তেরা সাঁই, আমি কিছু জানি নাই, সাঁই গো, নেক বান্দা, ভাল তেরা, বদির কি তুই নয়রে।। পাপীর দয়াল তুমি, শুনে বল করি আমি, সাঁই গো, নেকেরে করিলে দয়া ডাকি কেনে তোরে।। হীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, গুরুর চরণ তলে, সাঁই গো, অস্তিম কালেতে ফাঁকি দিওনা আমারে।।

৬২। নিজগুণে দয়া কর গুরু ভজন না জানি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

নিজগুণে দয়া কর গুরু ভজন না জানি।। ভজনহীন হয়ে ডাকি দয়াল নাম শুনি।। তুমি দীনের ধনী, আমি হই দীনহীনি, চাতকিনী হয়ে ডাকি পাব চরণ দু’খানি।। আমি নির্জনে এক দাসি হয়েছি, তোমার নামের জোরে ডঙ্কা মারতেছি, নামে ভাসালাম তরি, যদি ডুবিয়া মরি, তবে আমা হতে নামের গৌরব যাবে ও গুণমণি।। তোমার নামের জোরে অধম তরে যায়, আমি চেয়ে আছি ঐ নামের আশায়, আমি বড় অভাগী, কোন উপায় না দেখি, ভরসা করি তরে যাব নামে, এ ঘোর তুফানি।। এবার যা কর এই দীনহীনেরে, পড়ে রলাম চরণের আশা করে, অধীন পাণ্ডু কয় বাণী, আমি এই ভিক্ষা মাঙ্গি, তোমার রূপে নয়ন থাকে যে এ দিন রজনী।।

৬৩। গুরু চরণ ধরে পারে যাব গো, মনে ছিল বাসনা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু চরণ ধরে পারে যাব গো, মনে ছিল বাসনা।। স্বভাব দোষে রিপুর বশে, হারালাম ষোল আনা।। ভব সাগর বিষয় নদী গো, নদীর কূল বহুদূর, তুফান দেখে হত হলাম, কিসে পাব কূল, আমার কপাল দোষে পারের তরি, ভবে চেনা গেল না। দুঃখী তাপী দেখে দয়াল গো, ভাল তরি সাজায়েছে, তাতে রাধা নামে বাদাম তুলে ঘাটে এসেছে, ঐ নামের সুধায় জগৎ ভাসে মন কেনে তায় ডোবেনা।। বেহাল বেশে দয়াল চাঁদ গো, ভাল ঘাটে এসেছে কত পাপী তাপী অনায়াসে পারে নিতেছে, সাঁই হিরু চাঁদ কয় অধীন পাণ্ডু, ঘাটে কেন বসনা।।

৬৪। আমার মনের কথা এ জগতে গো, আমি বলিব আর কার কাছে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমার মনের কথা এ জগতে গো, আমি বলিব আর কার কাছে।। শুরু বিনে এ জগতে আমা বলতে কে আছে।। দয়া করে রূপ দেখায়ে গো বেহাল বানাইলে, কু-স্বভাব এই দেহে কেন বা রাখিলে, একূল ওকূল দু’কূল গেল কলঙ্ক হলো মিছে।। ষোল আনা এনেছিলাম গো, ব্যাপারের আশে, সাধের তরি বোঝাই করে, যাবরে দেশে, ত্রিবেণীর তিরধারে, তরি মারা গিয়াছে।। মণিহারা ফনী হয়ে গো, ভবে ঘুরাইলে, চৌরাশীর কোপে পলাম শ্রীচরণ ভুলে, পাণ্ডু কাঁদে কর্ম ফাঁদে মানব জন্ম যায় মিছে।।

৬৫। কি দিয়ে ভজিব গুরুজীরে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

কি দিয়ে ভজিব গুরুজীরে।। ভজনের কথা শুনি হাট বাজারে।। এমান আমান নাই, কোন গুণে গুরু পাই, সাঁই গো, গুরুকে ভজিতে সদা সাধু বলে মোরে।। দুধ দিয়া ভজিব গুরু আগে তাহা খায় গরু সাঁই গো, এটো দ্রব্য গুরু নিবে এমানের জোরে।। ভাত মাছ যত খাই, তাহাতে কি সেবা হয়, সাঁই গো, ভক্তি বিনে গুরু সেবা কিছুতেই নাইরে।। মন দিয়ে ভজি তাই, সে মন আমার নয়, সাঁই গো, কি দিয়ে ভজিব গুরু, দিশা নাহি হায়রে।। অমাপা অজপা সেই, গুরুসেরা তাহাতেই, সাঁই গো, পাণ্ডু বলে অমাপা যে বলে এমানেরে।।

 

৬৬। যার হয়েছে নিষ্ঠারতি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

যার হয়েছে নিষ্ঠারতি।। গুরুপ্রতি সদায় মতি, গুরু ভিন্ন নাই গতি।। তার সাক্ষী দেখ রাম অবতারে, হনু শিষ্য রাম নিষ্ঠা করে, কৃষ্ণ পশুর হলো, নিষ্ঠা প্রেমের এই রীতি।। গুরু নিষ্ঠ হলে ভজনের উপায়, আছে সত্য সর্ব শাস্ত্রে কয় সত্য প্রেমী গণ্য হয় তার, শমন পারে না ছুতি।। যার বাঞ্ছা আছে শ্রীচরণ বলে, পরের কথায় সে কি যায় টলে, ভুলোনা মন কারো ভোলে, করি তোমায় মিনতি।। যমন গোবরে পোকা ভ্রমরের সাথে, পীরিত করেছিল জগতে, পাণ্ডু বলে সৎএর সঙ্গে মলেও হয় গঙ্গাপ্রাপ্তি।।

৬৭। হেলায় হেলায় দিন ফুরালো।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

হেলায় হেলায় দিন ফুরালো।। বেতাইনি বেলা জানি কয়টা বেজে গেল।। দিন থাকিতে মন রসনাহে, মুখে আল্লার নাম সদায় বলো। আশা করো বিষয় করে হে, বড় সুখে রবা, ভেবে দেখ মন শমন এলে, কোন বা দেশে যাবা, অন্তিমকালে মধুসূদন হে, মন কার ভোলায় সে নাম ভোলো।। যা হবার তা হলো ভবেহে, ত্বরায় দোকান সারো, যে ধন আছে সে ধন নিয়ে মন, সাধ বাজারে চল, বড় লাভের বাজার মন রসনা হে, ঐ লাভ হবে পথের সম্বল।। বাজারেতে সন্ধান জেনে হে, প্রেমের ঘাটে নামো, অমূল্য ধন পাবা হাতে, সরল হয়ে ডোবো, পথ না চিনে সে ঘাট ভুলেহে, অধীন পাণ্ডু জনম হারালো।।

৬৮। মুখে বললে কি হয়, গুরু ধরে সাধন জানতে হয়।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মুখে বললে কি হয়, গুরু ধরে সাধন জানতে হয়।। ডুবে দেখ মনরায়।। নিষ্ঠা রতি যার হয়েছে, রস রতি সেই চিনেছে, এ ভবে উজানে সে তরি বেয়ে যায়।। তিন রতি তিন রসের খেলা, জানিলে মন যায় রে জ্বালা, এ সাধন দয়া করে গুরু যারে কয়।। আছমানে তিন রতি বয়, জমিনে তিন রসের উদয়, সুরসিক শুভযোগে মিলন করে তায়।। অধীন পাপ্পু কেঁদে বলে, গুরু সুখের সুখী হলে, সে জনে সহজ মানুষ ধরেছে নিশ্চর।।

৬৯। এস মন পারের চিন্তা বসে করি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

এস মন পারের চিন্তা বসে করি।। এনে মহাজনের ধন, ভবের হাটে মন, হারাবি সে ধন করিলে দেরী।। মায়া দাগাদার তারই কারবার, এই হাটে মন হবে না বেপার, এমনি দাগাদারী সদায় ভিলকী মারী, মহাজনের ধন করিল চুরি।। এস পার ঘাটার কলে বসি যেয়ে মন, পারের তরী সদায় করিগে স্মরণ, এসেছে একজন, দয়াল সে জন, গুরু বস্তু ধন নিতাই কাণ্ডারী।। পারের কাণ্ডারী কেবল আছে গুরুধন, না চিনিলাম তারে বিধি বিড়ম্বন, হিরুচাঁদ ভনে, পাণ্ডু ঘুরিস কেনে, পারের সম্বল কেবল শ্রী চরণ তরী।।

৭০। ভাবিনির ভাবে মনা, কাণ্ডারী নাও বশ করে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ভাবিনির ভাবে মনা, কাণ্ডারী নাও বশ করে।। অনুরাগের চরায় তুলে জ্বরাতরি নাও সেরে।। সাঁই নামে গাউনি করে, গাব কালি দাও নিরে ক্ষীরে।। ছয় দাড়ি মাঝির কাজে, দাও গা মন যার যা সাজে, শ্রী রূপের বাদাম তুলে তরী ভাসাও সাগরে।। ভক্তি শিলারী মনরে, এটে ধর না তারে, দাঁড়াইবে মেঘের আড়ে, তম ঝড় যাবে দূরে।। হিংসা নিন্দা দেবংশে ধন, ক্ষমা ধৈর্যে ফেলবে যখন, পাণ্ডু বলে যারে তুফান, হিরুচাঁদ নিবেন পারে।।

 

৭১। গুরু যার মনে তবরূপ লেগেছে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু যার মনে তবরূপ লেগেছে।। এইত ব্রহ্মাও মাঝে তার চক্ষুদানী হয়েছো।। পুত্র পিতা দ্বারা সুত, ভবের বন্ধু আছে যত, তুচ্ছ জ্ঞান করে, তীর্থ যাত্রা পর্যটন, গুরুর চরণে সব জেনেছে। গোবিন্দ হয় গৌরাঙ্গ চাঁদ, জগন্নাথ আর নিত্যানন্দ, গুরু সব জানে, নিষ্ঠারতি গুরুপদে, অন্যরূপ সে ছেড়েছে।। গৌর কি আর গাছে ধরে, গুরুরূপে গৌর ফেরে, এই সংসারে, গুরু সুখের সুখী হলে, ভব পারের ভয় কি তার আছে।। গুরু যার সদয় আছে, তার যম যাতনা দূরে গেছে, সাধু হয়েছে, হিরুচাঁদের চরণ ভুলে, পাঞ্জুর মানব জনম যায় নিছে।।

৭২। ভেবেছ দিন এমনি যাবে। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ভেবেছ দিন এমনি যাবে। দিনে দিনে দিন ফুরাল কয়দিন রবি ভবে।। ধন যৌবন জোয়ারের পানি, দেখতে দেখতে ভাটা হবে।। যৌবন ভাটা হলে কে সুধাবে তোরে, ভবের বন্ধু না চাহিবে ফিরে, পিতৃধন সব ফুরাইলে, শমনে ধরিবে।। যমন স্বপ্নে দেখি লক্ষ চাঁদের জ্যোতি, চেতন হয়ে পাইনে একটা বাতি, অস্তিম কালে এ যৌবনে, তমনি ফাঁকি দিবে।। করো দিন থাকিতে গুরুপদে মতি, অস্তিমে চরণ হবে সাথের সাথী, অধীন পাণ্ডু হল মৃঢ় মতি, কোন গুণে চরণ পাবে।।

৭৩। কে আছে মন সাথের সাথী।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

কে আছে মন সাথের সাথী।। ভেবে দেখ মন কয় দিন রবি ভবের পীরিতী।। ভব পারে হবে যাতি, কর গুরু পদে মতি।। পিছে পিছে ফিরছে যম রাজা, মিছে মায়ায় ভুলে করলি বড় মজা, যে দিন ধরবে শমন করবে সোজা, হবে কবেরেতে যাতি।। রাজার রাজ্যে এত সুখ ঐশ্বর্য, ভবের বন্ধু সব করিবে ত্যাজ্য, ভেবে দেখ মন সেই করবে, কিসে হবে গতি।। কে ভরাবে সে হিত বিপদে, দীন থাকিতে চেন দীননাথ, অধীন পাণ্ডু বলে গুরুর চরণ, রাখ হৃদয় গাঁথি।।

৭৪। তারে ধরব কি সাধনে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

তারে ধরব কি সাধনে।। ব্রহ্মা আদি না পায় যারে যুগ যুগান্তর বসে ধ্যানে।। বেদ পুরাণে পাবে নারে নিরূপ নিরাকারে, নিরাকার জ্যোতি ময়ে আছে বসে নিত্য স্থানে।। অনাদির আদি মানুষ আছে সে গোপনে, সেই মানুষে সাধ্য করে রাধাকৃষ্ণ বৃন্দাবনে।। চিত্তামান ভূমি বৃক্ষ কল্পমহি বনে, গোপী কৃপা যার হয়েছে, সেই পেয়েছে রত্ন ধনে।। সখীরূপে যে দেখেছে গুরুর ধিয়ানে, পাণ্ডু বলে সেই রসিকে, দাসি হব শ্রীচরণে।।

৭৫। মন কেন তুই ভুলে রলি মউতেরই কথা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মন কেন তুই ভুলে রলি মউতেরই কথা।। তোর ব্যথার ব্যথীত কে আর আছে, কে ঘুচাবে ব্যথা।। আলি বড় সাধ করে এই ভবের বাজারে, লাভে মূলে সব হারালি আশা হল বৃথা।। মন তুই সম্বল হারায়ে, মিছে রলি ভুলে বীজকরেট ভেল্কী দেখে, বোধ এই মায়াজালে, কোনদিন ঘিরিবে কালে, হাকিমের যমন ঝাঁকের পাখীতে, ঝাঁকে ঝাঁকে বিলে পড়ে আহার করিতে, আহার করে সকল বড় আনন্দ করে, কারো কপাল গুণে মাহার খেতে, ফাঁদে বাঁধে মাথা।। তমনি এই ভবে এসে, অধীন পাণ্ডু খাচ্ছে আহার দলে মিশে, সদায় করি হায়রে হায়, ভবে রহিবে সবার, কোন দিন পাণ্ডু নাম মোর ভেঙ্গে নিবে, আগে জগৎ কৰ্তা।।

৭৬। ভেবে দেখ তলব হলে হুজুরেতে যাবি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ভেবে দেখ তলব হলে হুজুরেতে যাবি।। আশার আশে বিষয় করে, আর কত কাল খাবি।। ভবে আলি কি বলে, মালেকের হুজুরে, ভেবে দেখ মন সেই কথা কি জবাব দিবি।। মন এই ভব মাঝে, সুখের সময় সুখের বন্ধু সবায় মিলে, ও মন অস্তিম কালে, কি হবে কপালে, গুরু বিনে দুঃখের কথা, আর বা কারে বলবি।। মন সেই নিদান কালে, ডাকতে হবে সে দিন কেবল আল্লা বলে, আহা করবে সকলে, তোর চৌদিকে ঘিরে, ধরে নিবে কাল শমনে কার বা পানে চাবি।। মনরায় যাবে ছাড়ি, সাধের দেহ রবে পড়ি, কেবল ধুলায় পড়ি, সাঁই হিরুচাঁদে কয়, পাণ্ডু হল না তোর ভয়, দিন থাকিতে না ভজিলে কোন গুণে আর তরবি।।

৭৭। আগে মন গুরু করবে কাণ্ডারী।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আগে মন গুরু করবে কাণ্ডারী।। পারঘাটায় তুফান মাঝে, চালাইবেন তরি।। আছে পঞ্চ জন দাড়ি, তাদের সহায় করি, যার যার দাড়ে তারে তারে, বসাও সারি সারি।। মাস্তুলে বাদাম দাও তুলি, সুবাতাসের ভাব জানি, উজান বাঁকে চালাও তরি, নামে গাও সারি, নদী বেগ ধরে ভারি, মন ভয় কি তোমারই, মাঝি ঐক্য হয়ে, রাখবে নোঙর করি।। যখন ভাটা যায় সারি, নদী দেখ নিহারী, নদী স্থলে মণি মুক্তা রহিবে পড়ি, মন আমার হয়ে ডুবারু, মণি মুক্তা নাও তুলি, দেখবি গুরু রূপের জ্যোতি উঠবে ঝলক মারি।। জ্বালায়ে রূপের বাতি, তরি বাও দিবা রাতি, বেয়ে সাধুর ভারা লও কিনারা ওমন বেপারী, অধীন পাণ্ডু কয় বাণী, শ্রীগুরু না চিনি, মিছে সাধুর ভারা ডুবাইয়ে খাবি খেয়ে মরি।।

৭৮। আমার অধম চাঁদ বিরাজ করে ভক্তের দ্বারে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমার অধম চাঁদ বিরাজ করে ভক্তের দ্বারে।। ধনীর নয়নে মণির নয়নে, ভক্তির কাঙ্গাল সাঁই মোরে।। কুলবতীর কুলের গৌরব, রূপসীর গৌরব যৌবন, ধনির গৌরব ধন, কোন গৌরবে পাবে না তারে, ভক্তির জোরে পায় বিদুরে।। কেউ ধরব বলে হয় সন্ন্যাসী, বৈরাগী কেউ তীর্থবাসী, ব্রহ্ম হুতাসী, তারা জনম ভবে ঘুরে মরে, ভক্ত পায় মূলাধারে।। জোলার ছেলে ভক্ত কবীর, ঘরে বসে গুরু ধরে, সে চরণ ধরে, মুচিরামের স্বর্গে ঘণ্টা, পাণ্ডু মরে অহঙ্কারে।।

৭৯। আয় নাগরী অধর ধরি ভক্তি ডোরে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আয় নাগরী অধর ধরি ভক্তি ডোরে।। যারে যোগী ন্যাসী পায়না ধ্যানে, সে চাঁদ ফেরে ঘরে ঘরে।। ভক্তি জোরে নন্দরানী, খাওয়াইয়া ক্ষীর লনী, বেঁধেছে তারে, মাখন চোরা বলে মারে, তবু সে বিনয় করে।। ভক্তি ভাবে রাখাল গণে, খেলা করে বৃন্দাবনে, স্কন্ধে চড়ে তার এটো ফল দেয় সে বদনে, মিঠাবলে পান করে।। ভক্তিভাবে গোপীনিরে, বেঁধেছিল প্রেম ডোরে, সে ব্রজপুরে, প্রেমদারে গোপীর চরণ ধুলা, সে মাথায় করে।। সে চাঁদ উদয় নদে পুরী, অঙ্গে মাখা রাধা প্যারী, ফেরে নগরে, তারে রসিক জনা ধরে চিনে, পাঞ্জু চৌরাশী ঘুরে।।

৮০। মনরে দিনের কথা কর মনে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মনরে দিনের কথা কর মনে।। এদিন গেলে অন্তিম কালে, গতি নাই গুরু বিনে।। মনগুরু ভব পারের কর্তা, সত্য সত্য সাধু বার্তা, গুরু যিনি পরমাত্মা, ভজ বর্তমানে।। মন ভব পারে যাবি যদি, গুরুপদে কর মতি, যদি হয় মন নিষ্ঠা রতি, ভাবনা কি সেই দিনে।। মন যে সাধনে গুরুবর্ত, দিন থাকিতে জান অর্থ, অধীন পাণ্ডু অপদার্থ, ভজন সাধনে।।

 

৮১। মন আমার বৃথা গেল দিন রজনী।।  ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মন আমার বৃথা গেল দিন রজনী।। মিছে ভোজের বাজীতে ভুলে হারাই রতন মণি।। ছিলি অন্ধকারে মন, দিয়ে অমূল্য রতন, বড় যত্ন করে, ভবে তোরে পাঠায় কাদির গণি।। সাজায়ে এ সাধের তরি, বোঝাই দিয়ে নূর নীরি, পাঠায়ে ছিল মালেক তোরে মন বেপারী, না চিনে কাণ্ডারী, মিছে ঘুরে মরি, সে ধন ফুরাইল জ্বরা হল এ সাধের তরণী।। যে ধন ভবে বিকা’লি, তার মূল্য না নিলি, কি বলে জবাব দিবি মালেকের হুজুরী, মাল কার কাছে দিলি, তা’র কি সদায় নিলি, না বুঝিয়ে ঢেলে দিলি বালুচরে চিনি।। সাধের জনম হারালি, মন ফিরে না চা’লি, কোন দিন ভোজের বাজী ভেঙ্গে যাবে মন তোমারই, হেলায় এ দিন ফুরা’লি, সাঁই হিরু কর বাণী পাণ্ডু মনের ভুলে ঘুরে মলি, আশি লক্ষ যোনী।।

৮২। রূপে যে দিয়াছে নয়ন।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

রূপে যে দিয়াছে নয়ন।। জেনেছে ব্রহ্মাণ্ড মাঝে, গুরু রূপে নিরঞ্জন। জেনে শুনে সঁপেছে সে গুরুপদে দেহ ধন।। তার মন হয়েছে ফুলের জ্যোতি, মধুর লোভে গুরু করে, আত্মার সঙ্গে সম্মিলন।। তার হৃদয় শুরু রাজা, গুরু পূজা সর্বক্ষণ, পূজা করে প্রাপ্তি করে, নিত্য মধুর বৃন্দাবন।। নিত্য সেবায় বর্ত হয়ে, করছে প্রেম আস্বাদন, সে যোগ্য অযোগ্য হয়ে, অধীন পাণ্ডুর যায় যায় জীবন।।

৮৩। সুখের দিন গিয়াছে, গুরু বিনে আমার কে আছে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

সুখের দিন গিয়াছে, গুরু বিনে আমার কে আছে।। এ ভবের যত খেলা, হল সব মিছে।। যৌবনের গুমার ছিল, দেখতে দেখতে ভাটা হলো, কোন দিন ধরবে কাল শমনরে, মন দাঁড়াবি কার কাছে, গুরু বিনে বন্ধু নাই সাধু হলেছে।। চুল পাক্‌লো দন্ত পোলো, বুদ্ধি বল হত হোলো, কি করতে ভবে এসে মন, কি করলি পাছে, আমার পাছের কথা ভুলে রয়েছে।। গুরু দেয় উপাসনা, দিন থাকতে মন রসনা, না করে সে ভজনারে, যাবি নরক বিছে, না ভজে পাণ্ডুর জনম বৃথা হয়েছে।।

৮৪। কোন গুণেতে ধরব শুরু মনের বিকার সারে না।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

কোন গুণেতে ধরব শুরু মনের বিকার সারে না।। মহা মায়ার ঘোরে প’ড়ে আমার স্বভাব ফিরে না।। জানি কোন অপরাধে, ভুলে এই মায়ামদে, অপারের কাণ্ডারী গুরুপদে নয়ন থাকে না।। শুরুর মন না জেনে ভজন করতে চায়, শিশু হয়ে চাঁদ ধরা তার হয়, সদা করে সে আয় আয় চাঁদ অমনি সরে যায়, তমন অবলা শিশুর মত গুরুর চরণ চেয়ো না।। ধরার ভাবনা জেনে যোগী হয়েছি, সাধু জনে বলবে রে ছি ছি, এই দেহে থেকে, জ্ঞান হলো না দেখে, সাধুজনে শুরু পাব বলে কুলমান রাখে না।। যে প্রেমেতে গুরু ধরা যায়, সামান্যে কি সে প্রেম জানা যায়, সাধু কৃপা হয়, পাণ্ডু বলে গোপী কৃপার শুরু ফেলে যাবে না।।

৮৫। দেখ স্বরূপ নেহারে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দেখ স্বরূপ নেহারে।। যদি দয়া করে মন তোমারে চক্ষুদানী শুরু করে।। দ্বিদলেতে সিংহাসনে, কিবা শোভা করে, কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ, অক্ষয় চাঁদের উপরে।। সখিগণ সঙ্গে লয়ে অটল বিহরে, তিল প্রমাণ জায়গায় বসে, আছে মানুষ সভা করে। চর্ম চোখে হবেনারে, গুরু কৃপা বিনে, অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলে, খেলছে মানুষ নীরে ক্ষীরে।।

৮৬। মুরশিদ চাঁদ কি ধরা যায় রে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মুরশিদ চাঁদ কি ধরা যায় রে।। আগে জেন্দা মরা নাহি মরে।। মরার সঙ্গে সঙ্গ ধরে, মরতে হয় স্বরূপ দ্বারে।। দু’ঞ্জন মরা জেন্দা মরারে সদায় মরে বাঁচে, দু’জন মরার মূল রয়েছে অধর মানুষের কাছে, মরা ধরে সন্ধি করে, থাক মরার ভাবে মরে।। এমন মরা কে দেখেছে রে, আপনি মরে আছে, যমে এসে যখন ধরে তখন মরা বাঁচে, তারা যমের সঙ্গে যুদ্ধ করে, দু’জনা যায় দু’দিক সরে।। মরা ধরে ভজন সাধন রে কর অনুরাগে, রাগে বাগে মরার কাঁদে, ধর মুরশিদ চাঁদে, অধীন পাণ্ডু বলে অবহেলে, পারে যাবে চরণ ধরে।।

৮৭। মরার ভাব লয়ে মন না মরিলে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মরার ভাব লয়ে মন না মরিলে।। দয়া করবে কেন মরণ কারে।। দু’জন মরা সুজন তারারে থাকে মানুষের কাছে, জীবেরে ডুবায়ে মারে মায়া নদীর মাঝে, যে ডুবায় সে তুলতে পারে, তারই সঙ্গে প্রেম করিরে।। মরার প্রেমে মত্ত হলেরে, সহজ মানুষ মিলে, সহজ রূপে নয়ন দিয়ে, রসের খেলা খেলে, সে নিত্য প্রেমে বর্ত হবেরে, কি করবে তার যমদূত কালে।। যে মরেছে এমন মরারে, তার কিসের অভাব আছে, ভবের খেলা মরার জ্বালা সকল জানে মিছে, সাঁই হিরু চাঁদের চরণ ভুলে, পাণ্ডুর জনম যায় বিফলে।।

৮৮। আছে যার গলায় গাথারে, ও জাড়ের কাঁথা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আছে যার গলায় গাথারে, ও জাড়ের কাঁথা।। মন সূঁচে ধ্যান কাপড়ে নামের সুতা।। অনুরাগ হৃদয় জ্বেলে, কাঁথা লয় গলায় তুলে, মহামায়ার শীত এড়ায়ে, প্রেমে মাতা।। কাঁথা গলায় করে, ভাবে মজে কৌপীন পরে, শ্রীরূপের দ্বারে যায়, ভিক্ষা মেঙ্গে খায়, ভবের ক্ষুধা মেরে কয় সে গুরু কথা।। চিন্তামণির ভাবে, চিন্তা কাঁথার বেহার পরে, থাকে চাতক হয়ে, রূপে নয়ন দিয়ে, গুরু সুখের সুখী হয়ে, মুড়ায় মাথা চরণ দাসী হয়ে, বেড়ায় ভাবের কাঁথা লয়ে, সাঁই হিরুচাঁদে কয়, ভেজন নাই আমার কোন গুণে হিরু চাঁদ মোর ভাব জানাবে।। হয়ে দয়াময়, পাণ্ডু তুই ধরে থাকরে প্রেমের লতা।।

৮৯। ভজন সাধন করবি রে মন কোন রাগে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ভজন সাধন করবি রে মন কোন রাগে।। আগে মেয়ের অনুগত হগে।। জগৎ জোড়া মেয়ের বেড়ারে, কেবল এক পতি সাঁইজি জাগে।। মেয়ে সামান্য ধন নয়, জগৎ করছে আলোময়, কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ, বুঝি আছে মেয়ের পায়, মেয়ে ছাড়া ভজন করারে, তা হবে না কোন যোগে।। যদি রূপার টাকা পায়, জীব কপালে ছোঁয়ায়, রজত কাঞ্চন স্বর্ণ রূপা, পতি দিচ্ছে মেয়ের পায়, এমনি ধনি চিনিরে, জীব পড়বেরে পাপের ভোগে।। মেয়ে নারে মারলে গুরুমারা আহ্লাদিনী রেখেছেন চৈতন্য গোসাঁই, দরশনে দুঃখ হরে রে, তার চরণে নিগে।। বলে হিরু চাঁদ আমার, মনোহর, আকর্ষণে জগৎ পতি দিল রাধার দাস স্বীকার, তুই ধরবি যদি চরণ, মেয়ের চরণ আগে।।

৯০। যে মানুষের মন হরে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

যে মানুষের মন হরে।। সে রয়েছে ঘিরে।। যে হরে প্রাণ হরে রে, পরকাল দিতেও পারে।। দেখে চমৎকার, চার অবতার, আসামীর কাছে মহাজনে হচ্ছে তাবেদার, বাপ বেটায় পুরুষরে, যার বেঁধেছে মোহরে।। বুঝার সাধ্য আমার, ভবে এ কেমন বিচার, যুগের মা বারার চাতকের প্রকার, পুরুষ মণি পরশ ধনীরে, তবু দেন বাবারে।। জানি কি ধন আছে তার, কিসে দেনাদার, না বুঝিয়ে বুঝি আশির ফের, মন উদ্ধার হবি ঘুচাবিরে, আগে মহাজনেরে।। এই সাগরে, মহাজনের ধন মেরে, দারমালি আসামী হলাম, আমায় কেবা উদ্ধারে, মুরশিদ হিরু চাঁদে জেন্দা মরে রে, থাকলে ঐ ধরে।।

৯১। রসের কথা অরসিকে বলো না ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

রসের কথা অরসিকে বলো না।। কয়লাকে ডুবালে, দুগ্ধের বরণ না।। মহারাজা বাঞ্ছা করলে, তিন করবে শত চিনি নিম্ন রোপণা, তাহে তিন গুণ তিত হল।। মিঠাগুণ হলনা।। যমন কাকা তোতা খঁাঁচাতে, যত্ন পোষ মানাতে, ধরাইব খেতে দেয় মাখন ছানা, তোতা বুলি নিবে, কাকের বুলি হবে দরিদ্র এক জংলা হতে, দাঁড়ায়ে বাদশার দ্বারেতে, বাদশা তারে করে, খেতে ডাব চিনি পানা, কামড়ে খেয়ে ভাঙ্গে, চুলে খেতে জানে না।। নগরে বিষম নদী, ডুবলি না নিরবধি, হিরুচাদের বাক্য ভুলে মন টোপা পানা, পাণ্ডু বলে ডুবে দেখ মন, পাবি লাল দানা।

৯২। যার জ্ঞান আছে, সে পদে নিহার দিয়ে রয়েছে । ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

যার জ্ঞান আছে, সে পদে নিহার দিয়ে রয়েছে। সর্বস্বধন গুরুপদে সমর্পণ করেছে।। অনুরাগের বাতি জ্বেলে, নয়নে রেখেছে, তীর্থ ত্যাজ্য করে স্বরূপ নিষ্ঠা করেছে, গরল খেয়ে সরল হয়ে, জেন্দা মরেছে।। অধর চাঁদের ভাবে, রতি শান্ত করেছে, ছয় রিপু কাজে দিয়ে, প্রেমের রসিক হয়েছে, রসামৃত পান করে, শমন ফাঁকি দিয়াছে।। শুরু সুখের সুখী হয়ে, সেবাদাসী হয়েছে, অন্ধকারে বাতি জ্বেলে, নিত্যধামে গিয়াছে, পাণ্ডু বলে মায়া জালে, আমার ঘিরে রেখেছে।

৯৩। দয়াল গুরু বিনে, পারের উপায় তোমার রে, ঘোর তুফানে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দিনে দিনে দিন ফুরাল, মৃত্যুকাল আছে সামনে রে, ভাবনা মনে।। ভব নদীর তুফান দেখে মরবি হুতাশে, কেউ হবে না সঙ্গের সাথী, পারে যাবি কেমন করে রে, সে কঠিন দিনে।। ভব নদী বল যারে, কুলে যাওয়া ভার, চক্ষু হবে ঘোর অন্ধকার, সেদিন কে তরাবে আর রে, সেই নিদানে।। কেবা আমার কারবা আমি, কে আমার আছে, ভব পারে যাবি যেদিন, সকল হবে মিছেরে, দেখ না জেনে।। ভবে কর পারের সম্বল শুন আমার মন, গুরুতে সম্বন্ধ হলে, অধীন পাণ্ডু কেঁদে বলেরে, তরবি সেখানে।।

৯৪। দয়াল গুরু ভুলে, জনম মায়ার ভোলে পড়ে রে, গেল বিকলে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

দয়াল গুরু ভুলে, জনম মায়ার ভোলে পড়ে রে, গেল বিকলে।। ভুল হলো মোর মূল সাধনে, কি বলে জবাব দিবিরে, নিকাশের কালে।। ভব নদী পারের বিধি, কি আমার আছে, ভজন শূন্য দেহ গুরু, ছোবে কোন গুণেরে, অস্তিম কালে।। গুরুর চরণ পারের সম্বল, ভব নদীতে, মন হলি তুই ভক্তিহীন, গুরুর চরণ মিলে কিসেরে, আমার কপারে।। ভুলে রলাম ভবের কূলে, কূল পাব কিসে, ভেবে দেখরে অবোধ মন তুই, হারা হলি দিশেরে, কূল গেল কূলে।। মন প্রাণ দিন থাকিতে সঁপ গুরুতে, এদিন গেলে সেদিন পাব, গুরু সখা হলেরে, পাণ্ডু তাই বলে।।

৯৫। গুরু রূপে নয়ন দেরে মন।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু রূপে নয়ন দেরে মন।। গুরু বিনে কেউ নাই তোর আপন।। গুরুরূপে অধর মানুষ দিবে তোরে দরশন।। পিতার ভাঙে কিরূপ ছিলি, মারের গর্ভে কিরূপ হলি মন, পূর্ব পরে নিরস্তরে, গুরুরূপে নিরঞ্জন।। রজবীজ মিলন কে করিল, কোথায় আছে তার আসন, ব্রহ্মাণ্ডের গড়ন গড়ে সে কোন জন।। কোথায় ছিলি কারবা সাথে ভবে আলি ওরে মন, অধীন পাণ্ডু বলে শুরু, ধরে কর তার অন্বেষণ।।

 

৯৬। ধরা যায়রে অধরে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ধরা যায়রে অধরে।। যদি নিষ্ঠা হয় স্বরূপ দ্বারে।। মূলাধার সেই অটল বৃক্ষ, আছে দুটি ফল ধরে।। লাল শ্বেত দুটি ফুল, পিতামাতা নাম ধরে, অর্টলের বরাতী মানুষ, গড়েছে ফল মৈথুন করে।। অটল মানুষ নিজরূপ, স্বরূপে সে রং ধরে, পিতামাতা পদ্ম ফুলে ভাসিছে সমুদ্দুরে।। মহাযোগ সমুদ্দুরে, অটল রূপ ঝলক মারে, পাণ্ডু বলে তীরধারে, ধর ভাটা জোয়ারে।।

৯৭। অধর চাঁদ মিলে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

অধর চাঁদ মিলে।। মুরশিদ আঁধার ঘুচালে।। দেখবি লীলা চাঁদের খেলা, খেলা বিলে।। চাঁদের সিংহাসনে উদয়, তিল প্রমাণ জায়গা বুঝার, রংমহাল তার, পান্নাতন সে আসন, ঘিরে সকলে।। অমাবশ্যা সে চাঁদের নাই, দিবা নিশি হচ্ছে উদয়, দেখলে দেখা যায়, মানব জনম সফল হবে, সে চাঁদ দেখিলে।। দেখে শুনে সাধন করে সে জন যাবে ভব পারে, সে চরণ ধরে, পাণ্ডু বলে সাধের জনম গেল বিফলে।। খোন্দকার পাণ্ডু শাহের পদাবলী ॥ ১৬৭ ৯৮। পাপের কারখানা।। গুরু বাক্য কেটে সাধু হবা মনে ভেবোনা।। শুরু সুখের সুখী হবা, অস্তিমে শ্রীচরণ পাবা মনরে, তাই বলে কুল নাশ করিলে, মদন জ্বালা গেল না।। রস না জেনে রসিক হলে, গুরু নিষ্ঠা না করিলে মনরে, মদ খাওয়া মাতালের মত, মাতলে চরণ পাবানা।। বাঞ্ছা ছিল ভজন করে, ভব সিন্ধু যাব তরে, মনরে পাণ্ডু ফকির রিপুর দোষে, হয়ে গেল দীন কানা।।

৯৯। লোভে মেতোনা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

লোভে মেতোনা।। গোপীর ভজন সত্য জাজন, মিথ্যা বলা গেলনা।। গোপী চিনে সরল মনে, গুরু কেন ভজনা।। এলে যদি ভবের হাটে, হয়োনারে ভূতের মুটে, মনরে, এক দোকানে বিকিকিনি, সদায় কেন করনা।। রসের ধারা জেনে নিয়ে, ভিয়ান কর ময়রা হয়ে, মনরে, পাবারে সে প্রেম রতন, জঠর জ্বালা করবেনা।। যমন কানা বিড়াল দধি বলে, মরেছিল তুলো গিলে, মনরে, পাণ্ডু মল চিটে গুড়ে, ভুলেরে মিছরী দানা।।

১০০। আমার মন আপন দেহ চেন।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আমার মন আপন দেহ চেন।। দেহের খবর না জানিয়ে, মিছে কোট কাছারী করছ কেন।। কুল দুনিয়ার খবর আছে, আঠারো মোকামের মাঝে কোন মোকামে সাঁই বিরাজে, হুশিয়ার হয়ে অর্থ জান।। লাহুত-নাছুত-মলকুত-জবরুত, কালের রুহু দেল দম ধর, চার মোকামে চারি ধর, লা-মোকামেস সাঁইর আসন।। হাহুত মোকামের ধারা জানলে যাবে অধর ধরা, তবে পাবি কূল কিনারা জেনে ভজ গুরু ধন।। আত্মতত্ত্ব পর তত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব জান সত্য, অধীন পাণ্ডু পায়না অর্থ, মিছে ফকির হলাম লোক জানান।।

 

১০১। গুরু বিনে মনের কথা বলব না।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু বিনে মনের কথা বলব না।। কারো বলবনা কিছু শুনবনা।। ব্যথার ব্যথীত বিনে অন্য জনে বললেও কিছু হবেনা।। শুন ওরে আমার মন, গুরু দিল পরম ধন, নিজে না করিয়ে যতন, করলি তারে বিতরণ, কেন বেনা বনে মুক্তা ফেলে, মন হলি তুই দিন কানা।। না করে ভজন সাধন, যারে তারে বলো না মন, পাষাণ দলন তোর কথায় মন হবে না, কারো ঠেশে ঠুশে ভজাইলে, কখনও সে ভজবে না।। যমন কাঠুরে এক মাণিক পেয়ে, বাজারেতে যায়গো ধেয়ে, দোকানেতে ফেলে দিয়ে, মূল্য নিতে জানেনা, তখন অবোধ কাঠুরের হাতে, মানিক কেহ দিওনা।। মন হয়েছে আলা ঝালা, ভজন সাধন করলে ঘোলা, হিব্রু চাঁদের চরণ দুটি ভুলোনা, অধীন পাণ্ডু বলে, মন রসনা, পরের মজায় মজো না।।

১০২। ও মনরে, গুরু বিনে কে তরাবে অপারে ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ও মনরে, গুরু বিনে কে তরাবে অপারে।। যে দিন মনরায়, যাবেরে ফাঁকি মেরে।। কোন দিন ভোজের বাজী করে, সুখের পাখী যাবে উড়ে, আদরিণী ছেড়ে গেলে আদর কে করবে তোরে, ভাই বন্ধু প্রিয়জনে, দিবেরে বাহির করে।। খাট পালঙ্ক ছেড়ে, মন তোর বিষয় রবে পড়ে, খালি হাতে একা পথে যেতে হবেরে তোরে, চৌরাশির কোপে পড়ে, মরবি রে ঘুরে ঘুরে।। এমন সাধের জনম পেয়ে, মিছে রইলি মন তুই ভুলে, দিন থাকিতে গুরুর চরণ আগে লও সাধ্য করে, পাণ্ডু বলে সাধের জনম, হারালাম হেলা করে।।

১০৩। বিনা সাধনে তার কি পাওয়া যায় ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

বিনা সাধনে তার কি পাওয়া যায়।। বেদ পুরাণে যার চিহ্ন নাই।। আছমান জমিন জোড়া মানুষ, মাকড়ার জালে ছাপিয়ে রয়।। কিঞ্চিৎ রূপে জগৎ আলো চর্ম চোখে টের না পায়, দিব্য নয়ন হলে পরে, দেখতে পায় সে জ্যোতির্ময়।। নিরাকারে জ্যোতির্ময় সে, তারই আকার জ্যোতির্ময়, নীরের হিল্লোলে মানুষ, স্বরূপ দ্বারে বারাম দেয়।। দেখলে সে দ্বার হয় চমৎকার, জীবে কী তার গর্ম পায়, পাণ্ডু বলে সাধুজনে যোগ সাধনে ধরে তায়।।

১০৪। আজব কারখানা বোঝা সাধ্য কার ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

আজব কারখানা বোঝা সাধ্য কার।। সাঁই করে লীলা ভবের পর।। এই মানুষে রঙ্গ রসে, বিরাজ করেন সাঁই আমার।। একটি ছিলেন দুটি হলেন, নীরে ক্ষীরে যুগোল তার, পুরুষ প্রকৃতি ঘটে, হরেক রঙ্গে দেন বাহার।। পাপীর ঘটে রঙ্গ দেখে হাকিম ঘটে দেন বিচার, দরিদ্রের ঘটে বসে ফিরতেছেন সাঁই দ্বার বেদ্বার।। পাণ্ডু বলে মানব লীলা করেছেন সাঁই চমৎকার, মানুষ ধর, মানুষ ভজ, মন যাবি তুই ভব পার।।

১০৫। ঘুমায়ে থেকনা রে মনা নয়ন খোল।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ঘুমায়ে থেকনা রে মনা নয়ন খোল।। চক্ষু মেলে দেখ, দীনবন্ধু রূপে করে আলো।। দেখ স্বরূপে রূপ করে আলা, শুরু খোলে রূপের গোলা, চোখে উদয় চিশ কালা, ভাল একাল পর কাল।। সিংহাসনে বসে কালা, করে সখী সঙ্গে লীলা খেলা, গলায় দোলে তারার মালা, দেখে কুলবতীর কুল গেল।। দেখলে যাবে জঠর জ্বালা, খেলবি তখন সখের খেলা, পাণ্ডু বলে ওমন ভোলা, ধন্য হিরুচাদে জাগাইল।।

১০৬। যে দেখেছে বন্ধুর রূপ সেত আর ভুলবেনা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

যে দেখেছে বন্ধুর রূপ সেত আর ভুলবেনা।। সেরূপ দেখতে আছে কইতে নাইক, রূপের না মেলে তুলনা।। দর্পণে যে রূপ দেখেছে, মনের আধার ঘুচে গেছে, রূপে নয়ন দিয়ে আছে, দূরে গেছে পারের ভাবনা।। সদা থাকে রূপ ধিয়ানে, দেবা দেবী মানবে কেনে, মন দিয়াছে শ্রীচরণে, গুরু ভিন্ন অন্য রূপ মানেনা।। সাধ্য সাধন গোপী সনে, ভজে গুরু বর্তমানে, প্রাপ্তি হয় তার নিত্যস্থানে, অধীন পাণ্ডুর মনের ঘোর গেলনা।।

১০৭। মিলবে গুরু কল্পতরু যে করে ধিয়ান।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মিলবে গুরু কল্পতরু যে করে ধিয়ান।। ছত্রিশ জাতের কর্তা গুরু হিন্দু মুসলমান।। হিন্দু তরায় হরি নামে, হজরত মুসলমান, হরি হযরত একই রূপ দেখনা বিধান।। গৌরব হল কুলমানে, যার জাত সেই বড় জানে, যার নাই কুলবালা, করনা সন্ধান।। কেউ বলে নীরদ আহ্লাদিনী, কেউ বলে নবী আত্মা গণি, কেউ সুন্নতে ছাফ করে তনু, কেউ ফোঁড়ে দুই কান, এ সকল বিধির কাহিনী, দরগা দূর্গা চূড়ামণি, পাণ্ডু করে ঠেনাঠেনি, হইলনা জ্ঞান।। পেয়েছো মানব জনম ভুলনারে আর।। আসা যাওয়া যে যাতনা, পেয়েছ মন বারে বার।। মানব জনম আল্লা দেয় যখন, করার করেছিলে করব, ভজন সাধন, করার মত কার্য হলে জনম সারা হবে তার।। মহামায়ার সংসারে এসে, একদিন পলোনা মনে যাবরে দেশে, জীবের ভুল সারিব বলে, গুরু ফেরে ঘরে ঘর।। পুণ্য মুক্তি যতই কর মন, কোন ধর্মে হয় না জন্মমৃত্যু যে খণ্ডন, পাণ্ডু বলে গুরু প্রাপ্তি হলে যাব ভব পার।।

১০৯। এমন দুর্লভ জনম হারাইওনা ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

এমন দুর্লভ জনম হারাইওনা।। পাথরে ঠুকিলে মাথা, এমন জনম আর হবে না।। চৌরআশি লক্ষ যোনী, পশু আদি শৃগাল গৃধিনী, ব্রহ্ম দরেন্দা, জনম পেেিয় মানব হয়ে, মানুষ কেন চিননা।। সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি, চার যুগে মন কোথায় ছিলি, ডুবে দেখতে হয়, মিছে দুদিনের দায় দুকূল হারায়, শেষ ভাবনা ভাবনা।। ধন পুত্র জরু মালে, কে ঠেকাবে অস্তিম কালে, কি হবে উপায়, সে দিন আপন জন্যে কাঁদবে সবায়, তোর জন্য কেউ কাঁদবে না।। ব্যথার ব্যথীত কে আছে মন, কারে বল আপন হিরুচাঁদে কয়, অধীন পাণ্ডু বলে মায়াজালে, গুরুর চরণ ভুলোনা।।

১১০। মানুষ মিলে, ভাগ্য ফলে ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মানুষ মিলে, ভাগ্য ফলে।। ডাকে যদি ভক্তি ভাবে দীনের কাঙ্গালে।। ব্রহ্মাণ্ডের পারাপারে, মূলাধার মূলে।। নাহি দিবা নাহি রাতি মন, মানুষের মহলে, চন্দ্র সূর্য যেতে নারে সে দল কমলে, জীবের ভাগ্যে মিলবে কেনে, বেহাল না হরে।। যোগেশ্বরীর মহাযোগে মন, কলে রস খেলে, সহজ রূপে দিচ্ছে বারাম, পবন হিল্লোলে, এসে মানুষ রং মহালে, দরজা খোলে।। চিন্তামণি ভূমি বৃক্ষে মন, সে ফল ফলে, সহজ হয়ে সহজ মানুষ ধরে বেহালে, পাণ্ডু বলে মিলবে কেনে, আমার কপালে।।

 

১১১। মুরশিদ তত্ত্ব কে সুধায় তা চিত্তে নারে।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মুরশিদ তত্ত্ব কে সুধায় তা চিত্তে নারে।। যে সুধায় জ্ঞান পাবার আশে, সে কি পুরাতন নহেরে।। রুহু ইনছানি হায়ানি, মুরশিদ বালকা এই দুই শুনি, লেখে ফোর কানে, মহামায়া রিপুর ভোলে, হায়ানি গোলমালে পড়ে, আপন মুরশিদ ইনছানিরে, না চিনে পড়েছে ফেরে।। হাওয়া লতিফা রুহানি, সবের মুরশিদ হয় ইনছানি, পূর্ব পরে তাই, মহম্মদি রুহু বহে, ইনছানি লা মোকাম নূরে, হায়ানি কালেবে থেকে, না চিনে ফের মুরিদ হয়রে।। বে মুরিদ এই অজুদেতে, কেহ নাই তা সত্য বটে, চিনারই দরকার, দয়া করে মুরশিদ দেখায়, তারে মুরশিদ বলিতে হয়, পাণ্ডু বলে আঁধার ঘুচায়, থাকব তার চরণ ধরে।।

১১২। বিছমিল্লার মানে তোরে বলব কি।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

বিছমিল্লার মানে তোরে বলব কি।। বিচেতে বিছমিল্লা আছে, শুনেছি সাধুর মুখি।। নব্বই হাজার মানে আছে বিছমিল্লায় শুনেছি, বিছের কথা না জানিলে সাধন ভজন হবে কি।। নিরাকারে ডিম্বভরে অন্ধকারে হল কি, বিছমিল্লা বলেছেন আল্লা কুদরতি এক নূর দেখি।। আদ্য মাতার আদ্য বস্তু জীবে তার জানে কি, পাণ্ডু বলে ভেদ খুলিতে ঝোরে আমার দুই আঁখি।।

১১৩। যেভাবে সাঁই করেছে আমার।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

যেভাবে সাঁই করেছে আমার।। ভবে জ্ঞান হলনা মন তোমার।। বড় সাধ করিয়ে সাঁই দরদীরে, করলেন মানব লীলা চমৎকার।। সাঁই মনের সাধে আদম গঠেছে, স্বরূপ রসে মিশে বারাম দিতেছে, প্রভু রসে ডোবে রসে ভাসেরে, প্রভু রসের নদী দেয় সাঁতার।। যে রসে সাঁই নিত্য বিহারে, সে ভাব ব্রহ্ম আদি নরে না জানে, প্রভু জীবের জন্য সে ভাব এনেরে, কেঁদে ফেরে সদায় ঘরে ঘর।। সেভাব জানাতে দয়াল চাঁদ মোরে, বড় অমূল্য নাম দিচ্ছে সবারে, গুরু নাম না জপে প্রেম না জেনেরে, পাঞ্জুর আসা যাওয়া হল সার।।

১১৪। মন আয়না চলে যাই সাঁইজীর লীলা দেখিতে ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মন আয়না চলে যাই সাঁইজীর লীলা দেখিতে।। সুরধনী গঙ্গার ঘাটেতে।। জলের মধ্যে ফুল ফুটেছেরে, সৌরভে জগৎ মাতে।। ফুলের মূল রয়েছে গোলক নগরে, পাতালপুরে দীপ্ত করতেছে, সে ফুল ধরব বলে সাধু জনারে, বসে আছে যোগ ধিয়ানেতে।। ফুলের মধু পান করব বলে, দয়াল কেলে সোনা ভ্রমর হয়েছে, প্রভু গুণ গুণ স্বরে রব ধরেছে রে, জীবে না পায় জানিতে।। শুভ যোগে মেঘে সে ফুল ফুটতেছে, যেজন যোগ চিনে সেই ঘাটে বসেছে, সে কোটি তীর্থের ফল পেয়েছেরে, পেরেছে অধর চাঁদকে ধরিতে।। বড় আজব লীলা হচ্ছে সেই ঘাটে, বিষম অন্ধকারে বাতি জ্বলতেছে, পতঙ্গের মত হয়ে পাণ্ডুরে, উড়ে পড়ে পুড়ে মরিতে।।

১১৫। গুরুপদে নিষ্ঠা রতি কর আমার মন ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরুপদে নিষ্ঠা রতি কর আমার মন।। গুরুতে আসক্তি হলে খুলে যায় ভব বন্ধন।। আশি লক্ষ যোনীতে ভ্রমণ করিয়ে, মানব জনম পেয়েছরে মন, গুরু কৃপা না হইলে, জনম যাবে অকারণ।। এ সাধের জীবন যৌবন, কোন ঘড়িতে হয়ে যাবে পলকে পতন, গুরু বিনে ভবের খেলা হবেরে নিশির স্বপন।। হেলায় বেলা ডুবে এল মন, গুরুতে সম্বন্ধ করে কররে আপন, পাণ্ডু বলে দিন ফুরাল আল্লার নাম কর স্মরণ।।

১১৬। ভক্তির জোরে না ধরিলে মুখের কথায় কে পায় তারে ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

ভক্তির জোরে না ধরিলে মুখের কথায় কে পায় তারে।। ভক্তের হৃদয় হরি বসে, সদায় ঝলক দেয় অন্তরে।। বনের পশু ভক্ত হনুমান, শ্রীরাম চন্দ্রের শ্রীপাদ পদ্মে সঁপে ছিল প্রাণ, তার চিত্ত পটে রামরূপ ছিল, দেখায় হনু বক্ষ চিরে।। হরি ভক্ত ছিল বিদুরে, ভবের পর এক দরিদ্র সে অন্ন নাই ঘরে, ভক্তি জোরে তাহার ঘরে, খুদের অন্ন ভজন করে।। হরি ভক্ত মুচিরাম একজন, কেটোর জ্বলে গঙ্গা এসে দিল দরশন, গ্রামে ঘন্টা স্বর্গে বাজে, অধীন পাণ্ডু ঘুরে মরে।।

১১৭। মানুষ গুরু কল্পতরু বিশ্বাস হবে যার অন্তরে ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

মানুষ গুরু কল্পতরু বিশ্বাস হবে যার অন্তরে।। গুরুকে গৌরাঙ্গ জেনে সদায় ঐরূপ নিহার করে।। অনুরাগে ধরেছে যারে, মন প্রাণ দেহ ধন অর্পণ করে, কুলশীলের ভয় রাখেনা, ব্রজ গোপীর ভাবে ফেরে।। মানব রূপে ফিরতেছে হরি, নিষ্ঠা রতি যার হয়েছে হরি হয় তারই, রসিক ভক্ত হরি প্রাপ্ত করতেছে ভজন করে।। ব্রজ গোপীর মহাভাব ধরে, পঞ্চভাবের পঞ্চগুণে বেধেছে তাঁরে, নিত্য সেবায় বর্ত থাকে, আত্মসুখে পাণ্ডু ফেরে।।

১১৮। গুরু কেনে ভাবনা ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু কেনে ভাবনা।। আমার অবোধ মন তুমি চেতন হয়ে দেখ না।। সে চরণ বিনে, ভব সিন্ধু নীরে, পারে যেতে পারবা না।। গুরু ধনে ধনি, যত গুণমণি, চরণের গুণি, মানব হয় পাষাণী, অমূল্য রতন, গুরুর চরণ, অমূল্য রতন, কি দিব তার তুলনা।। গুরুরূপে মন, দিয়াছে যে জন, সে জন সুজন, জর করে শমন, ধরে সে চরণ, জঠর যাতন, ঘুচায়েছে সে জনা।। যে পদ পরশে, পরশ হয় এ দেশে, বিপদে সুপদে সে পদ ভুলনা, গুরুর চরণ, জানে সাধু জন, পাপ্পু হল দিনকানা।।

১১৯। গুরু বস্তু না জেনে ।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

গুরু বস্তু না জেনে।। এমন সাধের জনম, যাররে জমের ভুবনে।। স্বভাবের গুণে, কুম কুপথে গমনে, হারালি গুরু ধনে।। করিয়ে যতন, শুরু দিল ধন, সে ধন সাধনে, বঞ্চিত হলি মন, সেবা অপরাধী, নামে হলি বাদি, ঘিরে এল শমনে।। মন করিলি হেলা, ডুবে এল বেলা, ভব পারের ভেলা, শ্রীগুরুর চরণ, ভজন বিহীন, হলি চিরদিন, চরণ পাবি কোন গুণে।। করে ভবের খেলা, সুখে হলি ভোলা, ঘটে এল জ্বালা, অন্তিম সামনে, সাধন শূন্যদেহ, সুধাবেনা কেহ, বোঝেনা পাণ্ডুর মনে।।

১২০। শুনরে মন রসনা।। ফকির খোন্দকার পাঞ্জু শাহ

শুনরে মন রসনা।। যদি কর প্রেমের বাসনা।। ভক্তি মূল্যে না কিনিলে, অমূল্য প্রেম.পাবানা।। সাধু শাস্ত্রে গেল জানা, প্রেম প্রাপ্তির উপায় ভক্তি, ভক্তি চেনা গেলনা, কিরূপ ভক্তি কি আকৃতি, জানলে হয় উপাসনা।। শুনি ভক্তি এই পদার্থ, অহং না থাকিলে তিনি, এ ব্রহ্মাণ্ড শোষিত, কি জন্য অহং মাৎসর্য করে তার প্রবঞ্চনা।। ভক্তি কোথায় হয় উৎপত্তি, ঊর্ধ্ব কি হয় অধোঃগতি, কোথায় বারাম খানা, ভক্তির সৃষ্টি কর্তা যে জন, সে বা হয় কেমন জনা।। ভক্তি চিনে কর সাধ্য, ভক্তি দেশে সাঁইজী এসে, প্রেমরসে হয় বাধ্য, হিরুচাঁদ কয় অধীন পাণ্ডু, মানব দেহে দেখনা।।

 

Leave a Comment